বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে মুদ্রা নির্বাচন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)–এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন ডলারের পরিবর্তে জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানে ঋণ নিলে কিস্তি পরিশোধে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তবে এই কৌশল নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে।
ইআরডির নীতিপত্রে বলা হয়েছে, ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ ঋণ যদি জাপানি ইয়েনে নেওয়া হয়, তবে মোট পরিশোধ খরচ ডলারের তুলনায় ২০ কোটি ডলারেরও বেশি কম হতে পারে। একই পরিমাণ ঋণ চীনা ইউয়ানে নিলেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
২০২৪ সালের জুনে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে নেওয়া একটি বাজেট সহায়তা ঋণের উদাহরণ টেনে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ওই ঋণ ডলারে পরিশোধ করলে মোট ব্যয় দাঁড়াত প্রায় ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার কিন্তু বিকল্প মুদ্রায় হিসাব করলে চিত্র বদলে যায়। ইয়েনে নিলে ব্যয় নেমে আসে প্রায় ৪৯ কোটি ২০ লাখ ডলারে, অর্থাৎ প্রায় ২০ কোটি ২০ লাখ ডলার সাশ্রয় সম্ভব। অন্যদিকে ইউয়ানে একই ঋণের ব্যয় দাঁড়াত প্রায় ৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ডলারের তুলনায় প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার কম।
সুদের হারের ব্যবধানই মূল কারণ। বর্তমানে ডলারভিত্তিক ঋণের খরচ তুলনামূলক বেশি, কারণ এর বেঞ্চমার্ক সুদের হার ৫ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে জাপানের দীর্ঘদিনের নমনীয় মুদ্রানীতির কারণে ইয়েনে সুদের হার মাত্র ১.৫ থেকে ১.৭ শতাংশের মধ্যে। চীনা ইউয়ানে এই হার প্রায় ২.৫ শতাংশ। ফলে একই অঙ্কের ঋণ হলেও মুদ্রাভেদে মোট পরিশোধ ব্যয় অনেক পরিবর্তিত হচ্ছে।
ইআরডি এখন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং চীনের নিয়ন্ত্রিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) থেকে বহুমুদ্রাভিত্তিক ঋণ গ্রহণের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে সংস্থাটির কিছু কর্মকর্তা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যমান বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ ইতোমধ্যে ইয়েনে রয়েছে। ফলে একই মুদ্রায় নির্ভরতা বাড়লে ঝুঁকি কেন্দ্রীভূত হতে পারে। তারা বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে ইউরোকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাশ্রয়ের সুযোগ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক আয় মূলত ডলারনির্ভর। ফলে ইয়েন বা ইউয়ানে ঋণ বাড়লে ভবিষ্যতে পরিশোধ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, মুদ্রা বৈচিত্র্য কৌশল গ্রহণ করতে হলে আয়ের উৎসও সেই অনুযায়ী সম্প্রসারিত হওয়া জরুরি।
মাল্টি-কারেন্সি ঋণের পথে বাংলাদেশ:
বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় ধীরে ধীরে নতুন কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। ডলার নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার কৌশল এখন বাস্তব রূপ পাচ্ছে। সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গত অর্থবছরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কালিয়াকৈর বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য নেওয়া ১৬ কোটি ডলারের ঋণ ছিল দেশের জন্য একটি নতুন মাইলফলক। এই প্রথম কোনো একক ঋণ চুক্তিতে তিনটি মুদ্রা ব্যবহার করা হয়। ঋণের অর্থায়ন বিভাজন ছিল এমন—মার্কিন ডলার ১০ কোটি ৯৭ লাখ ৮০ হাজার, ইউরো ২ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার এবং চীনা রেনমিনবি ১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ইউয়ান।
এখন সরকার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)-এর অধীনে ‘এক্সপান্ডেড ঢাকা সিটি ওয়াটার সাপ্লাই রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পে ৩২ কোটি ডলারের একটি ঋণ কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই ঋণে ডলার, ইউরো এবং রেনমিনবি একসঙ্গে ব্যবহৃত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি কিস্তি ছাড়ের আগে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো মুদ্রা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ একক বাধ্যবাধকতার বদলে থাকবে নমনীয়তা।
এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি সুবিধা যুক্ত করেছে। এখন ঋণগ্রহীতারা পুরো মেয়াদে সর্বোচ্চ চারবার ঋণের মুদ্রা বা সুদের হার পরিবর্তন করতে পারবেন। তবে এই সুবিধার সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। প্রতিবার সুদের হার পরিবর্তনে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি ডলার এবং মুদ্রা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৩০ কোটি ডলারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় দুই বছরেরও বেশি আগে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বৈদেশিক ঋণ এবং অর্থায়নে চীনা ইউয়ান ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়।এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ হ্রাস করা।
নীতিগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর একক মুদ্রার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। বরং বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার একটি কৌশলগত পথে অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন যেমন সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি নতুন ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও সামনে আনছে।
কারেন্সি বাস্কেটের পক্ষে যুক্তি:
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা মুদ্রাঝুড়ি পদ্ধতি গ্রহণের সুপারিশ করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। তাদের পলিসি ব্রিফে বলা হয়েছে, একক কোনো মুদ্রার ওপর নির্ভর না করে ডলার, জাপানি ইয়েন এবং চীনা ইউয়ানের সমন্বয়ে ঋণ কাঠামো তৈরি করা উচিত। এই কৌশলকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ‘হেজিং’ বা ঝুঁকি কমানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। ধারণাটি হলো, একটি মুদ্রার মান বাড়লে অন্য মুদ্রার ওঠানামা সেই প্রভাব কিছুটা ভারসাম্য রাখতে পারে।
ইআরডির এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস-এর কিছু নীতিগত সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ডলারভিত্তিক ঋণের সুদের হার ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি চাপ তৈরি করছে। এই দুই বাস্তবতাই বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রধান কারণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মুদ্রার বৈচিত্র্য একটি প্রাকৃতিক হেজিং হিসেবে কাজ করতে পারে। তার ভাষায়, বড় কোনো ঋণ যদি ডলার, ইউরো ও ইয়েনের মধ্যে ভাগ করা থাকে, তাহলে কোনো একটি মুদ্রার মান বেড়ে গেলে অন্যটির ওঠানামা সেই চাপ কিছুটা সামলে নিতে পারে। ফলে পুরো ঋণ কাঠামোর ওপর একক মুদ্রার ঝুঁকি কমে যায়।
তবে তিনি একই সঙ্গে বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। তার মতে, “আপনি যে মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছেন, আদর্শভাবে সেই মুদ্রাতেই আপনার আয় থাকা উচিত।” বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে মার্কিন ডলারে, কিছুটা ইউরোতে। কিন্তু জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানে আয়ের পরিমাণ খুবই সীমিত।
এই পরিস্থিতিতে যদি ইয়েন বা ইউয়ানে ঋণ নেওয়া হয়, তাহলে কিস্তি পরিশোধের সময় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সেই মুদ্রা কিনতে হবে। এতে সম্ভাব্য সাশ্রয় অনেক ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে, এমনকি নতুন আর্থিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। আয়ের কাঠামো ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে বাংলাদেশ এখন একদিকে সাশ্রয়ের সুযোগ দেখছে, অন্যদিকে সেই সাশ্রয় টেকসই করতে গেলে বাড়তি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় মুদ্রা বৈচিত্র্যের যে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর ভেতরেই একমত নেই। যদিও নীতিগতভাবে কারেন্সি বাস্কেট বা মুদ্রাঝুড়ি পদ্ধতির পক্ষে সুপারিশ রয়েছে, বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক কর্মকর্তা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ইআরডির একাংশের কর্মকর্তারা মনে করেন, ডলার এখনো বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। এই অবস্থায় ইয়েনে অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের যুক্তি অনুযায়ী, জাপানি ইয়েন গত কয়েক দশকে ডলারের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে। ১৯৯৫ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েন ছিল ৯৬.৬১, যা ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৫.৯২-এ। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, জাপানের মুদ্রানীতিতে যদি হঠাৎ কঠোর পরিবর্তন আসে, তাহলে ইয়েন দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৯.৬ শতাংশ ইয়েনে রয়েছে, যা মুদ্রা বৈচিত্র্যের হিসেবে তৃতীয় স্থানে। এই অবস্থায় আরও ইয়েনভিত্তিক ঋণ বাড়ানো হলে ঝুঁকি কমার বদলে উল্টো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কিছু কর্মকর্তা। তাদের মতে, বৈচিত্র্য আনতেই হলে ইউরোকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নীতিগত আলোচনায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মাল্টি-কারেন্সি ঋণ তখনই কার্যকর, যখন নির্দিষ্ট মুদ্রায় পর্যাপ্ত আয়ের প্রবাহ থাকে। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সেই মুদ্রা কিনতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত খরচ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়িয়ে দেয়।
মাসরুর রিয়াজের মতে, এই কৌশল সম্প্রসারণের আগে বাংলাদেশের উচিত বিভিন্ন মুদ্রায় আয় করার সক্ষমতা, বৈদেশিক রিজার্ভের পর্যাপ্ততা এবং লেনদেন খরচ গভীরভাবে মূল্যায়ন করা। ইআরডিও তাদের নীতিপত্রে এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুদ্রার সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এই আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—কাগজে-কলমে মুদ্রা বৈচিত্র্য সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করলেও বাস্তব প্রয়োগে তা জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।ডলারভিত্তিক ঋণের ক্রমবর্ধমান খরচ কমাতে বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে ঠিকই, তবে সেই পথে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে আর্থিক চাপ উল্টো বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “এটি খারাপ কৌশল নয়, যদি তা বাস্তবায়নের মতো সক্ষমতা থাকে।
বাংলাদেশ এখন ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের সুযোগ, অন্যদিকে মুদ্রা ঝুঁকির জটিল হিসাব। এই ভারসাম্যই ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

