মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে এই সংকট থেকে কবে উত্তরণ ঘটবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। ফলে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর পরামর্শ দিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তা অনুসরণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বরং আসন্ন বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণের চাপও বাড়ছে সরকারের ওপর। নতুন সুবিধাভোগী যুক্ত করা এবং ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও আলোচনায় রয়েছে, যা ব্যয় আরও বাড়াবে। এদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এখন মহাসংকটের মধ্যে রয়েছে। তার ভাষায়, রাজস্ব ঘাটতি ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কবে ফিরবে তা অনিশ্চিত। ফলে অর্থনীতির গতি ফেরার সময়ও স্পষ্ট নয়। আগামী বাজেটে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি উন্নত না হলে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
ড. মজিদের মতে, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আয় বাড়ানো। একই সঙ্গে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়াতে বাধ্য হলে বাজেটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। তবে অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই চাপ এড়ানো সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অসন্তুষ্ট হতে পারে এবং ঋণের কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সরকারের সামনে কঠিন ভারসাম্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এ উদ্যোগ না নিলে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য:
দেশের অর্থনীতির বর্তমান গতিপথ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো এখন ভালো সংকেত দিচ্ছে না, যা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাজেট তৈরি করতে হচ্ছে, যেখানে কাগজে-কলমে হিসাব মিললেও বাস্তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানো হলেও তা কোন খাতে কতটা দেওয়া হবে—সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক হিসাব প্রয়োজন। সরকারের আয় বাড়লে এমন চাপ কম থাকত। তবে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনমান রক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। ফলে এই খাতে ব্যয়ের চাপ থেকে সরকারের পক্ষে খুব বেশি ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই।
অর্থনীতির সাম্প্রতিক তথ্যও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই–এপ্রিল সময়ে দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপও এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ধীর থাকায় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে মিশ্র চিত্র। এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সুখবর নয়; বরং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ৬ শতাংশে আটকে আছে, যা বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, দেশের শিল্প খাত বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। তিনি মনে করেন, ভর্তুকি ও প্রণোদনা না বাড়ালে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি পেতে হলে সরকারকে আগামী বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমানোর শর্ত মানতে হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই শর্ত পূরণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির চলমান সংকট ও ব্যবসা–শিল্প খাতকে সচল রাখতে ভর্তুকি কমানো বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাবে সৃষ্ট বৈদেশিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনার জন্য মোট ১ লাখ ৫ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৪৫৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগামী বাজেটে এ খাতে ব্যয় বাড়ছে ৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ পরিকল্পনায় দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাস খাতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সার খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার হিসাব করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধিও আগামী বাজেটে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধীসহ মোট ১৫টি কর্মসূচির আওতায় প্রায় সাড়ে ১১ লাখ নতুন উপকারভোগী যুক্ত করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির ভাতার হার ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা।
আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও কৃষক কার্ড কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্তি এবং ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সরকার খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। চলমান বৈশ্বিক সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চালের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হচ্ছে। এদিকে বাজেট প্রক্রিয়ায় সামাজিক সুরক্ষা খাতকে আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, যাতে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমানো যায়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত দুই সরকারের সময়ের স্থবির অর্থনীতির ভার বর্তমান সরকারের কাঁধে এসেছে। তার ভাষায়, অর্থনীতি এখন কঠিন সময় অতিক্রম করছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। মন্ত্রীর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট, প্রবাসী শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তনসহ একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হয়েছে অর্থনীতিতে। তবে সব চাপের মধ্যেও সরকার ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।

