আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন বাজেটে বিভিন্ন ভাতা, খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপি সরকারের ঘোষিত কয়েকটি ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দরিদ্র, অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান ভাতা কর্মসূচিগুলোর উপকারভোগী সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট চূড়ান্তকরণ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তব্যে বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
বর্তমান অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এ বরাদ্দ বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সরকার আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ডের উপকারভোগী সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ লাখে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ৮০ হাজার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা।
কৃষকদের জন্য সরকার চালু করতে যাচ্ছে বড় পরিসরের কৃষক কার্ড কর্মসূচি। চলতি অর্থবছরে সীমিত পরিসরে এ কার্যক্রম শুরু হলেও আগামী অর্থবছরে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে এ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতি কৃষক বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাবেন। এ খাতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সরকারের আরেকটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি হচ্ছে খাল খনন কার্যক্রম। চলতি অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে ২৬ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ যুক্ত থাকলেও আগামী বছর তা বাড়িয়ে ৩৪ লাখ ২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ব্যয় কমে ৭৫ কোটিতে নামতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী বাজেটে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগী সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত ভাতার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
বর্তমানে ৬১ লাখ মানুষ মাসে ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হবে। ৯০ বছরের কম বয়সীরা মাসে ৭০০ টাকা পাবেন। আর ৯০ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ব্যক্তি মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ক্ষেত্রে উপকারভোগীর সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে ২৯ লাখ নারীকে ভাতা দেওয়া হবে। তাদের মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২৫ হাজার নারী মাসে ১ হাজার টাকা পাবেন।
প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় বর্তমানে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রয়েছেন। আগামী অর্থবছরে এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৬ লাখ করা হবে। যদিও মূল ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকছে, তবে ৯০ বছরের বেশি বয়সী প্রতিবন্ধীরা মাসে ১ হাজার টাকা ভাতা পাবেন।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। যদিও উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে না, তবে মাসিক সহায়তা ৫০ টাকা করে বাড়বে।
ফলে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা মাসে ৯৫০ টাকা, মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ১ হাজার টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা ১ হাজার ১০০ টাকা এবং উচ্চতর স্তরের শিক্ষার্থীরা ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে পাবে।
ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে পক্ষাঘাত, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে ৬০ হাজার রোগীকে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হলেও আগামী বাজেটে ৬৫ হাজার রোগীকে ১ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬৫০ কোটি টাকা।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’র উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১৮ লাখ ৯৫ হাজারে নেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন করে যুক্ত হবে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার মানুষ। এ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেকে মাসে ৮৫০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আগামী অর্থবছরে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক পরিবারের সদস্যদের ভাতা ৫ হাজার টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার মাসে ৪০ হাজার টাকা, বীর উত্তম পরিবার ৩০ হাজার টাকা এবং বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক পরিবার ২৫ হাজার টাকা করে ভাতা পাবে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ৫৫ লাখ পরিবারকে ছয় মাস ধরে ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ সুবিধা পাবে ৬০ লাখ পরিবার।
এ ছাড়া ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ১৩ লাখ ২৬ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৫ লাখে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৪ লাখ মানুষ দৈনিক ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাচ্ছেন। পাশাপাশি ১০ লাখ ৪০ হাজার নারী মাসে ৩০ কেজি চাল পাচ্ছেন। এসব কর্মসূচি আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও উপকারভোগী বাছাইয়ে স্বচ্ছতার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার যে লাইফ সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো চালু করতে যাচ্ছে, তা ধীরে ধীরে সার্বজনীন কাভারেজের দিকে যাবে। তবে বাস্তবায়নের শুরুতেই উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
তার মতে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে এখনো এমন অনেক ব্যক্তি সুবিধা পাচ্ছেন, যারা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য নন। এতে লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা বণ্টনের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়তে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা জরুরি। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা। রাজস্ব ঘাটতি থাকলে এসব উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

