বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ কমানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। প্রস্তাব অনুযায়ী, ধাপে ধাপে দেশের ৮০ শতাংশ আমদানি পণ্য বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) বা অফডক থেকে খালাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিডার এই প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে। এর উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্য সহজ করা এবং ব্যবসা করার পরিবেশ আরও উন্নত করা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যের বড় একটি অংশ সরাসরি বন্দরে খালাস হয়, যার কারণে নিয়মিত জট তৈরি হয়। বিডার মতে, যদি আইসিডির ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাহলে বন্দরের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হবে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হলে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)-এর কার্যক্ষমতা প্রায় ১.৬ থেকে ২ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে। এতে পণ্য পরিবহন ও খালাস প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত হবে। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুধু ৬৫ ধরনের আমদানি পণ্য আইসিডির মাধ্যমে খালাসের অনুমতি দেয়। যদিও রপ্তানির প্রায় সব কাজই দেশের ২১টি অফডকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিডার মতে, আমদানিতে সীমিত সুযোগ থাকায় বন্দরে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং পণ্য খালাসে সময়ও বেশি লাগছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিবহন খরচ কমবে, পণ্য পৌঁছানোর সময় (লিড টাইম) কমে যাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনো ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, বন্দরের কার্যকারিতা এবং লজিস্টিক সংস্কারের ধীরগতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এখন শুধু দাম ও মান নয়, সময়ও বড় একটি প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯টি কনটেইনার (টিইইউ) হ্যান্ডেল করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা আবুল কাসেম খান বলেন, আইসিডির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বন্দরের চাপ অনেক কমে আসবে এবং জটও হ্রাস পাবে। তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে বেশিরভাগ দেশে আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম মূল বন্দর এলাকার বাইরে পরিচালিত হয়।
বিডা শুধু আইসিডি সম্প্রসারণ নয়, ব্যাংকিং ও কাস্টমস সেবাকেও ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে বন্দর কার্যক্রম কিছুটা চললেও ব্যাংকিং সেবা সীমিত সময়ের মধ্যে থাকায় লেটার অব ক্রেডিট (এলসি), পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্সসহ নানা প্রক্রিয়ায় দেরি হয়। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং সেবা সপ্তাহজুড়ে এবং সার্বক্ষণিক চালু রাখা হলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও দ্রুত হবে। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়ার বড় অংশ অনলাইনে নিয়ে আসারও সুপারিশ করা হয়েছে।
বিডা আরও প্রস্তাব করেছে, কাস্টমস সিস্টেম অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিস্টেম একত্র করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এতে ব্যবসায়ীরা একবার তথ্য দিলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থায় পৌঁছে যাবে। ফলে বারবার তথ্য দেওয়ার ঝামেলা কমবে, সময় বাঁচবে এবং প্রশাসনিক জটিলতাও কমে আসবে। ব্যবসায়ী নেতা আবুল কাসেম খান বলেন, লাইসেন্স ও অনুমতির পুরো প্রক্রিয়া যদি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বাণিজ্য প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
সম্প্রতি এনবিআর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের এক বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী জানান, ব্যবসা সহজ করতে বাধাগুলো ধীরে ধীরে দূর করা হবে, যাতে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অর্থনীতি এগিয়ে যায়। সব মিলিয়ে, বিডার এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

