দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট এখন আরও গভীর রূপ নিচ্ছে। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং ঋণ সংকট একসঙ্গে মিলিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতকে চাপে ফেলছে।
ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। যেসব ঋণ মিলছে, সেগুলোর খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম ও এলপিজির মূল্য বৃদ্ধি, যা শিল্প ও গৃহস্থালি উভয় খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। পরিবহন খরচও বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতে উৎপাদন খরচ অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ছে এবং একাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত তিন বছরে দেশে অন্তত ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে শিল্পকারখানাগুলো।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট চললেও সরকার ব্যয়ের ঘাটতি পূরণে বড় পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করছে। জানা যায়, এ খাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। এতে সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বর্ধিত মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের জীবনে। সীমিত আয়ের মানুষদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত পে স্কেল বাস্তবায়নও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুলে রয়েছে। এই খাতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে ঘোষিত সুবিধা না পাওয়ায় সরকারি কর্মচারীরাও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে উৎপাদনশীল খাতে। তাঁর ভাষায়, “সরলভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে যখন সুদের হার বাড়ানো হয়, তখন তার আঘাত সরাসরি গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীল খাতের ওপর। ব্যাংকঋণের এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে পণ্যের উৎপাদন খরচ আর প্রতিযোগিতামূলক থাকে না। কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি মেটানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যখন বাড়তি সুদের বোঝা টানতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসার নিট মুনাফায় টান পড়ে।”
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এখন এক জটিল ও বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কঠোর মুদ্রানীতি মিলিয়ে শিল্পোৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবন উভয়ই গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিনের ঋণ সুদের সীমা বা ক্যাপ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর ব্যাংকঋণের সুদ এখন ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় ৩০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে যাওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিল্প খাতেও চাপ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় গড়ে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম ও এলপিজির উচ্চমূল্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এই সম্মিলিত চাপে গত তিন বছরে অন্তত ৪০০টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা যায়।
বর্তমানে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন কার্যত স্থবিরতার মুখে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের লেনদেন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে।
জ্বালানি খাতে চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ১৮ এপ্রিল দেশে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। নতুন দরে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর ট্রাকভাড়া কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, গত তিন মাসে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির দামও দ্রুত বেড়েছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা হলেও বাজারে তা কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে। গত ফেব্রুয়ারিতে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা প্রতি ইউনিট এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড় দাম ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। প্রস্তাব কার্যকর হলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প—সব খাতে বিদ্যুতের ব্যয় আরও বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

