রহিম ও করিম—দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু এবং এখন আলাদা দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। বাইরে থেকে দেখলে তাঁদের আয় প্রায় একই রকম। কিন্তু কর প্রদানের ধরনে এবং আয়ের স্বচ্ছতায় রয়েছে বড় পার্থক্য, যা দেশের করব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
রহিম প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা বেতন পান। তাঁর নিয়োগকর্তা নিয়ম অনুযায়ী উৎসে কর কেটে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেন। ফলে তাঁর আয়, কর এবং সম্পদ—সবই নথিভুক্ত ও স্বচ্ছভাবে আয়কর রিটার্নে প্রতিফলিত হয়। তাঁর সম্পদ বৃদ্ধিও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
অন্যদিকে করিমের আয়ও প্রায় একই পরিমাণ হলেও তাঁর আয়ের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে আসে। বাকি ৭০ শতাংশ দেওয়া হয় নগদে। ফলে তাঁর আয়ের পূর্ণ চিত্র কর কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট নয়। এ কারণে তাঁর সম্পদ বৃদ্ধি ঘোষিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হলেও সেটি যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই দুই ধরনের বাস্তবতা এখন দেশের করব্যবস্থায় অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে অনেক কোম্পানি তাদের প্রকৃত আয় ও ব্যয় গোপন রাখে। এতে কর আদায়ের ভিত্তি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তিশ্রেণির সর্বোচ্চ আয়কর হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে (ইত্তেফাক, ৩১ মার্চ, ২০২৬)। তবে প্রশ্ন উঠছে—এতে কি সত্যিই রাজস্ব বাড়বে, নাকি চাপ বাড়বে শুধু নিয়ম মানা করদাতাদের ওপর?
বর্তমানে বাংলাদেশের করজাল অত্যন্ত সীমিত। দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ নিবন্ধিত ই-টিআইএনধারী থাকলেও তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। অথচ এই ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ছায়া অর্থনীতিতে সক্রিয়।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরাই মোট ব্যক্তিশ্রেণির আয়করের প্রায় ২৩ শতাংশ প্রদান করেন। এর পাশাপাশি সম্পদ সারচার্জ মিলিয়ে দেশে ব্যক্তিগত করের চাপ ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বেশি। বর্তমানে ৩০ শতাংশ সর্বোচ্চ করহার এবং ৩৫ শতাংশ সারচার্জ মিলিয়ে কার্যকর করহার দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশে।
যদি সর্বোচ্চ করহার ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়, তাহলে কার্যকর করহার ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি সারচার্জ বাতিল করে সম্পদ কর চালু করা হলেও, একজন করদাতার মোট করভার আয়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি হয়ে উঠতে পারে—কারণ কোনোভাবেই সম্পদ কর করযোগ্য আয়ের চেয়ে বেশি হবে না।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উচ্চ নিট সম্পদশালী ব্যক্তিরা দেশের মূলধন গঠনের অন্যতম প্রধান উৎস। তারা স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেন, করপোরেট খাতে অংশীদার হন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু অতিরিক্ত করের চাপ তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে দেশীয় মূলধন বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, অথবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
ইতিহাস বলছে, শুধু করহার বাড়ালেই কর আদায় বাড়ে না। ২০১৪ সাল থেকে করহারের ওঠানামা থাকলেও রিটার্ন দাখিলের হার প্রায় একই রয়ে গেছে। ফলে করহার বৃদ্ধির চেয়ে করজাল সম্প্রসারণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ বছরের শুরুতে গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সও কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল, অতিরিক্ত করের বোঝা বাড়ানোর ওপর নয়। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, করনীতি নির্ধারণে এখনই একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
২০২২-২৩ অর্থবছরের এনবিআরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার করদাতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ করধাপে ছিলেন। অর্থনীতির তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি নগদনির্ভর ও অপ্রকাশিত ব্যবসাগুলোকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কার্যকর অডিট ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
একই সঙ্গে আয়কর ও সম্পদ সারচার্জের সম্মিলিত প্রভাব পুনর্মূল্যায়নেরও প্রয়োজন রয়েছে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি করহার কাঠামো, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক এবং একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। নীতিনির্ধারকদের মতে, করনীতি শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার নয়; এটি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার একটি কাঠামো। সৎ করদাতাদের পুরস্কৃত করা এবং কর ফাঁকি রোধ—এই দুইয়ের ভারসাম্যই ভবিষ্যতের করনীতির মূল চ্যালেঞ্জ।

