বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য খেলাপি পরিস্থিতি এড়াতে বেক্সিমকো লিমিটেডের ৩ হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন সুকুক’-এর মেয়াদ আরও ছয় বছর বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকা এই সুকুকের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩২ সাল পর্যন্ত নেওয়া হতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ গৃহীত হয়। বৈঠকে ‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনা’র শর্ত ও কাঠামো পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়।
তবে এই মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন প্রয়োজন হবে। কারণ, বন্ডের মেয়াদ, অনুমোদন এবং মুনাফার হার পরিবর্তনের চূড়ান্ত এখতিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির হাতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মেয়াদ বাড়ানো হলে সুকুকের বর্তমান ৯ শতাংশ মুনাফার হারও বাড়তে পারে। সম্ভাব্যভাবে এটি ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বন্ডের বিদ্যমান আয়হারকে বিবেচনায় রেখেই এ পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। বর্তমানে ওই ট্রেজারি বন্ডের আয়হার ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
সুকুক পুনর্গঠন নিয়ে কয়েক মাস ধরে দুটি আলাদা কমিটি কাজ করেছে। এর মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং অন্যটি ছিল সুকুকের ট্রাস্টি ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি। দীর্ঘ আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কমিটি। এখন আইসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসইসিকে এ বিষয়ে অবহিত করবে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুকুকের ‘সিঙ্কিং ফান্ড’ থেকে করতোয়া সোলার পার্কের জন্য আর নতুন অর্থায়ন করা হবে না। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রকল্পটির যন্ত্রপাতি ও ট্রান্সফরমারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পটি পুনরায় চালু করতে আরও প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বেক্সিমকো বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ চাইলে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি পুনরায় সচল করতে পারবে। সেক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়া নির্ভর করবে সুকুক বিনিয়োগকারীদের পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ হওয়ার পর।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবসায়িক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া কোম্পানিটির পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এই সুকুকের প্রায় ৯৭ শতাংশ বিনিয়োগ এসেছে বিভিন্ন ব্যাংক ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে। নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করা না গেলে বন্ডটি খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর তাতে ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে, যা পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ তৈরি করবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কমিটি।
আইসিবির তথ্য অনুযায়ী, সুকুকের অর্থায়নে নির্মিত তিস্তা সোলার প্ল্যান্ট বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। প্রকল্পটি থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। এই আয়ের মধ্যে প্রায় ৭ কোটি টাকা পরিচালন ব্যয় হিসেবে বেক্সিমকোকে দেওয়া হয়। বাকি অর্থ সুকুকের মুনাফা পরিশোধ এবং সিঙ্কিং ফান্ডে জমা রাখা হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের হিসাব বলছে, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বকেয়া থাকা এই সুকুক বর্ধিত ৭২ মাসে আরও প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আয় করতে সক্ষম হতে পারে। এছাড়া বর্তমান মেয়াদের এখনও সাত মাস বাকি রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্প থেকে আরও প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সিঙ্কিং ফান্ডে জমা হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, বিদ্যমান তহবিল ও ভবিষ্যৎ আয় মিলিয়ে সংশোধিত সময়সীমার মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের সব পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
সুকুকের শর্ত পুনর্গঠন ও পর্যালোচনার জন্য গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক, আইসিবি, বিএসইসি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বিভিন্ন শীর্ষ ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২১ সালে বেক্সিমকো লিমিটেড দেশের প্রথম সম্পদভিত্তিক শরিয়াহসম্মত করপোরেট গ্রিন সুকুকের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে।
এর মধ্যে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় ৫৫৮ কোটি টাকা। সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হয়েছে তিস্তা সোলার প্ল্যান্টে। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা, তবে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে করতোয়া সোলার প্রকল্পে ৩০৮ দশমিক ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৯ কোটি টাকা। এছাড়া বেক্সিমকোর টেক্সটাইল বিভাগের সম্প্রসারণে ব্যয় করা হয়েছে ৮০৬ কোটি টাকা। ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার করতোয়া প্ল্যান্টটি ২০২৬ সালের জুনে চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ট্রান্সফরমার ও সাইট অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকল্পটির কাজ আরও পিছিয়ে গেছে।

