দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘদিনের নির্মাণকাজ শেষের দিকে পৌঁছালেও প্রকল্প ঘিরে এখন বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে রাশিয়ার ঋণ ও পাওনা পরিশোধের জটিলতা নিয়ে। নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা ও বিকল্প সমাধান না মেলায় এই সংকট এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তা ও ঋণে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪১ কোটি টাকায়। এর মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকার সমান।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। রাশিয়ার ওপর আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশও নিয়মিতভাবে অর্থ পাঠাতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কোনো ব্যাংক অর্থ গ্রহণ করতে পারছে না। বিকল্প উপায়ে সমাধানের চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পথ বের হয়নি। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকে আলাদা এসক্রো অ্যাকাউন্টে অর্থ রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পাওনা পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকে তিনটি এসক্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টে ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২০ কোটি ডলার জমা হয়েছে।এর মধ্যে রূপপুর প্রকল্পের জন্য আলাদাভাবে জমা রয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। বাকি অর্থ রাশিয়ার অন্যান্য কেনাকাটার দায় পরিশোধে সংরক্ষিত।বর্তমানে প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনে পরিশোধযোগ্য মোট দায় দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ডলারের কিছু বেশি।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক লেনদেনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা। সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়ার পর বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়াতে দেশটির সঙ্গে লেনদেন সীমিত করেছে।ফলে চীনসহ সম্ভাব্য বিকল্প ব্যাংকিং চ্যানেলও কার্যকর হয়নি। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ঝুঁকি এড়াতে চায়।
অতীতে একাধিক বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। ২০২৪ সালে রাশিয়ার একটি প্রটোকল অনুযায়ী চীনের পিপলস ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট সিস্টেমে (CIPS) যুক্ত হওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের বৈদেশিক রিজার্ভ ও রপ্তানি নির্ভরতার বাস্তবতা বিবেচনায় সেই উদ্যোগও এগোয়নি।
এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের একটি প্রস্তাবও আসে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় সেটিও কার্যকর হয়নি।
রূপপুর প্রকল্পের মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চে। পরে সময়সীমা পরিবর্তন হয়ে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর এবং আরও পরে ২০২৯ সালের মার্চের প্রস্তাব ওঠে। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কিস্তি শুরুর সময় নির্ধারণ করে। অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে একই সময়ে প্রকল্প শেষ, উৎপাদন শুরু এবং বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ—সবকিছু একসঙ্গে সামনে আসছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ঋণ পরিশোধের প্রস্তুতি বাংলাদেশের রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে অর্থ পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না।
২০২২ সালে রাশিয়া নিজেই বাংলাদেশকে সাময়িকভাবে পরিশোধ স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছিল। পরে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বর্তমানে সবার নজর এখন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতির দিকে। কারণ এর ওপরই নির্ভর করছে রূপপুর প্রকল্পের আর্থিক নিষ্পত্তি ও ভবিষ্যৎ গতি। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—উৎপাদনের আলো জ্বালানোর আগে কি অর্থনৈতিক জটিলতার অন্ধকার কাটবে রূপপুরে?
সিভি/এম

