আসন্ন বাজেট ঘিরে এখনই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। প্রতি বছরই একই চিত্র দেখা যায়—বাজেটকে বলা হয় বিশাল, অভূতপূর্ব বা ঐতিহাসিক কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজেটের আকার কি সত্যিই সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ?
মানুষ জানতে চায় বাজারে আলু–পেঁয়াজের দাম কমবে কি না। শ্রমিক খুঁজে ফেরে কাজের নিশ্চয়তা। উদ্যোক্তা হিসাব করে দেখে লাইসেন্স পেতে তাকে কতটা হয়রানির মুখে পড়তে হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর বাজেটের অঙ্কে নেই, থাকে বাস্তব অর্থনীতির গতিপথে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ এখনো তিন মাসের কম। তাই পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সময় এটি নয়। তবে কিছু পর্যবেক্ষণ স্পষ্টভাবে সামনে আসে। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা ছিল কিন্তু উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগে ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। নতুন সরকার সেই জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে বলেই ধারণা হচ্ছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময় বাড়ানো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক।
তবে উদ্বেগও কম নয়। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি কিন্তু সেই দিকের দৃঢ় ইঙ্গিত এখনো দুর্বল। সম্প্রতি ব্যাংক রেজুলেশন আইনে এমন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে, যেখানে বিতর্কিত পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একইভাবে রাজস্ব সংস্কারেও দৃঢ়তার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না, সংস্কার ছাড়া ঘাটতি থেকেই যাবে—এটি এখন বাস্তবতা।
এবারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তিনটি বড় চাপ সামনে রয়েছে। প্রথমত, রাজস্ব ঘাটতি—যা অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল জায়গা। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ভর্তুকির বাড়তি চাপ। তৃতীয়ত, নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হলে শুধু বাজেট বড় করাই সমাধান নয়; দরকার সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ একের পর এক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা সামলাচ্ছে—কোভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জ্বালানি সংকট। এই বাস্তবতায় বড় বাজেট ঘোষণা কতটা অর্থবহ, যদি তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকে? দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, বাজেট ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় প্রায়ই অনুপস্থিত। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বছর বছর পূরণ হয় না, তবুও পরের বছর লক্ষ্য আরও বাড়ানো হয়। কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতি থাকলে এই চক্র ভাঙা কঠিন।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চিত্রে আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য হলো, দেশ এখনো মূলত গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এই দুটি খাত অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে—এতে সন্দেহ নেই কিন্তু প্রশ্ন হলো, আগামী দশ বছরেও কি আমরা একই দুই স্তম্ভের ওপর ভর করে চলব?
বৈচিত্র্যের কথা বহু বছর ধরেই বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি সীমিত অথচ কৃষি খাতে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেবা খাতও নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। প্রতিটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সেই পথে যেতে হলে দরকার স্পষ্ট কৌশল—শুধু ঘোষণার পুনরাবৃত্তি নয়।
একটি বড় বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই—দুর্নীতি ও প্রশাসনিক হয়রানি। যে উদ্যোক্তার রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই, তাঁর জন্য ব্যবসা শুরু করা প্রায় এক দীর্ঘ লড়াইয়ের মতো। লাইসেন্স পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুমতি—প্রতিটি ধাপেই জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এই দুই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করে রেখেছে। অথচ কার্যকর ও একীভূত ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা গেলে এই জটিলতার বড় অংশ সহজেই কমানো সম্ভব।
পরিসংখ্যান আরও একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে কমছে। একসময় এই খাতই দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রতীক ছিল। সেই অবস্থান হারানোর আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কর্মসংস্থান বাড়ানো মানে শুধু বড় অঙ্কের চাকরির ঘোষণা নয়। বহু বছর ধরেই লাখো কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত। প্রকৃত কর্মসংস্থান তৈরি হয় তখনই, যখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবে সম্প্রসারিত হয়। কৃষি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সেবা খাতকে ঘিরে একটি সমন্বিত খাতভিত্তিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানবসম্পদের মান। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া নতুন খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। গার্মেন্টস খাতের শীর্ষ পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক বিদেশি কর্মীর উপস্থিতি আমাদের দক্ষতার ঘাটতির একটি বাস্তব উদাহরণ। এই ঘাটতির শিকড় অনেকাংশে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত।
বাজেট সাধারণত তিনটি উপাদানের সমন্বয়—বরাদ্দ, ব্যয়ের কৌশল এবং অর্থনৈতিক সংকেত। কিন্তু আমাদের আলোচনায় প্রায় সবসময় প্রথম উপাদানটি নিয়েই বেশি কথা হয়। বাকি দুটি দিক প্রায় অনালোচিত থেকে যায়। অথচ একটি কার্যকর বাজেট শুধু অর্থ বরাদ্দের তালিকা নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের প্রতিফলন।
সরকারের বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক উদ্যোগ—যেমন ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড—উদ্যোগ হিসেবে ইতিবাচক। তবে এসব কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে এবং বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত না করা হলে এর সুফল সীমিতই থেকে যায়। এখানে তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ—দক্ষতা, সমন্বয় এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
এবারের বাজেট সব সমস্যার সমাধান দেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু বাজেটের মাধ্যমে অন্তত একটি স্পষ্ট বার্তা থাকা জরুরি। সেই বার্তা হতে পারে—সরকার সংস্কারের পথে অগ্রসর হতে প্রস্তুত, বাস্তব সংকটকে স্বীকার করছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগ গড়ে তুলতে চায়। এই সংকেতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বিনিয়োগকারীকে আস্থা দিতে পারে, উদ্যোক্তাকে সাহস জোগাতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারে—রাষ্ট্র তাদের বাস্তব সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সবশেষে প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু উত্তরটা অস্বস্তিকর—আমরা কি আবারও কেবল বড় অঙ্কের বাজেটের গল্প শুনব, নাকি এবার সত্যিই বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখব?
কারণ ইতিহাস বলছে, বাজেটের অঙ্ক বড় হলেও যদি মাঠের অর্থনীতি একই পুরোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই বড় সংখ্যাগুলো মানুষের জীবনে খুব বেশি পার্থক্য গড়ে না। বরং প্রতিবারের মতোই প্রত্যাশা বাড়ে, হতাশা জমে। এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাজেট কত ট্রিলিয়ন টাকার হলো তা নয়; বরং এই বাজেট কি সত্যিই সেই ব্যবস্থার ভিত নাড়াতে পারবে, যেখানে দুর্নীতি, হয়রানি আর অদক্ষতা বিনিয়োগকে থামিয়ে রাখে?
উত্তরটা হয়তো বাজেট ঘোষণার দিনেই মিলবে না কিন্তু তার ইঙ্গিতটাই বলে দেবে—আমরা একই চক্রে ঘুরব, নাকি নতুন পথে হাঁটার সাহস সত্যিই শুরু হয়েছে।
সিভি/এম

