বাংলাদেশে আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর উচ্চ সংরক্ষণমূলক শুল্কের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার নামে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা উচ্চ শুল্কব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশে অনেক পণ্যের দাম প্রায় অর্ধেক বেশি হয়ে গেছে।
এতে প্রতি বছর দেশের ভোক্তাদের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে দাবি করেছেন অর্থনীতিবিদরা। রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বর্তমানে উচ্চ শুল্ক কাঠামোর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন ভোক্তারা। তার মতে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশের বেশি ক্ষতি হচ্ছে কেবল অতিরিক্ত শুল্কজনিত মূল্যচাপের কারণে।
‘বাণিজ্য নীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগের প্রভাব ও ভোক্তা কল্যাণ’ শীর্ষক ওই আলোচনা সভার আয়োজন করে পিআরআইয়ের সেন্টার ফর ট্রেড অ্যান্ড প্রোটেকশন পলিসি রিসার্চ। সেখানে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা দেশের বর্তমান বাণিজ্য নীতির প্রভাব নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বাণিজ্য নীতির মূল অংশীদার ভোক্তারা হলেও বাস্তবে তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বাজারে মূল্যস্তর এখন ভারতের তুলনাতেও বেশি। ফলে একই পরিমাণ মার্কিন ডলার দিয়ে বাংলাদেশে ভারতের চেয়ে কম পণ্য কেনা যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণবাদ কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য কার্যকর হতে পারে না। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শিল্প গড়ে তোলা, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম।
মূল প্রবন্ধে দেশের বর্তমান শুল্কব্যবস্থা, বিনিময় হার নীতি এবং রপ্তানি কৌশলে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন ড. জাইদী সাত্তার। তার মতে, বর্তমান কাঠামো একদিকে যেমন ভোক্তাদের ওপর মূল্যচাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও দুর্বল করছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের গড় শুল্কহার প্রায় ২৮ শতাংশ। যা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় চার গুণ বেশি। আর উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় প্রায় দশ গুণ। সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ বিভিন্ন প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত হলে কার্যকর শুল্কহার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছে যায়।
এছাড়া ২০২২ সালের পর থেকে টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয়ও একই হারে বেড়েছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়েছে বলে মত দেন তিনি।
ড. সাত্তার বলেন, ১৯৯২ সালে কাস্টমস ডিউটি ৭০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ১৪ শতাংশে নেমে এলেও একই সময়ে প্যারা-ট্যারিফ বেড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে শুল্ক উদারীকরণের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। বরং কর কাঠামো আরও জটিল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্পনীতিতে এখনো রপ্তানিবিরোধী প্রবণতা রয়েছে। আমদানিবিকল্প শিল্পগুলো যেখানে গড়ে ২৮ শতাংশ সুরক্ষা সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে রপ্তানি খাতের গড় ভর্তুকি মাত্র ৭ শতাংশ। এর ফলে পোশাকশিল্পের বাইরে অন্য রপ্তানি খাতগুলো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, তৈরি পোশাক খাতের জন্য তুলনামূলক উন্মুক্ত নীতি থাকলেও অন্য খাতগুলোতে এখনও উচ্চ সুরক্ষাবাদী কাঠামো কার্যকর রয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে অদক্ষ ও অপ্রতিযোগিতামূলক শিল্প টিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বৈঠকে জাতীয় শুল্কনীতি ২০২৩ দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বিনিময় হার নীতির সমন্বয় বাড়ানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
এছাড়া ধাপে ধাপে শুল্কহার কমানো, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নীতি সংস্কার এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আলোচকরা মনে করেন, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে আরও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে ব্যবসা ও কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার নীতি নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণের আহ্বান জানান।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদ দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আরও উন্মুক্ত বাজারের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, কোনো কোনো শিল্প অতিরিক্ত সুবিধা পেলেও অনেক শিল্প একেবারেই সুরক্ষা পাচ্ছে না। তার মতে, নীতিনির্ধারণের চেয়ে এনবিআরের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
আলোচনায় আরও অংশ নেন রাশেদা কে চৌধুরী ও ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তারা বলেন, ভোক্তা কল্যাণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত বাণিজ্য, শিল্প ও করনীতি গ্রহণ জরুরি।

