বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি বাড়ে, মানুষের ব্যয় কমে যায় এবং অনেক দেশ অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিতে পড়ে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই আশঙ্কা সামনে আসছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কর আদায়ে চাপ বাড়ায় সরকারগুলোকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে, যা আবার নতুন করে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
চলমান জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। অঞ্চলটিতে দ্বিতীয় দফা জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মুদ্রার মান কমে গেছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বখ্যাত বিজনেস স্কুল ইনসিডের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দত্ত পুশান বলেন, এশিয়া এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ছাড়া অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই বড় তেল আমদানিকারক। শিল্পনির্ভর অর্থনীতির কারণে এসব দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদাও অত্যন্ত বেশি।
যদি জুনের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক চেন চিয়েন-মিং জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। প্রায় ৭০ দিন ধরে সরবরাহ ব্যাহত থাকায় বর্তমানে ঘাটতির পরিমাণ ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও পশ্চিম টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড—উভয়ের দামই ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের আশেপাশে রয়েছে। অধ্যাপক চেনের মতে, বাজারে আপাত স্বাভাবিকতা থাকলেও বাস্তবে তেলের ঘাটতি স্পষ্ট। বিনিয়োগকারীরা এখনো আশা করছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে বলেই দামের ওপর পূর্ণ চাপ তৈরি হয়নি।
মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের আগে বৈশ্বিক তেলের মজুত তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে ছিল। সেই মজুতই এখন বড় ধরনের ধাক্কা সামাল দেওয়ার কাজ করছে। ফলে জ্বালানির দাম হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।
তবে পরিস্থিতি যে দ্রুত জটিল হচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট। জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের মজুত থাকা ৮৪০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারযোগ্য মাত্র ৮০ কোটি ব্যারেল। এর বাইরে থাকা মজুত ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ যুদ্ধের প্রভাব সামাল দিতে ২৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক পণ্য গবেষণা প্রধান নাতাশা কানেভার নেতৃত্বাধীন বিশ্লেষক দল জানিয়েছে, স্থলভাগে সংরক্ষিত তেলের বড় অংশ সহজে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। পাইপলাইন সচল রাখা ও সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুল পরিমাণ তেল কার্যত আটকে আছে।
বর্তমান সংকটকে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি তুলনা করা ঠিক হবে না। তখন মূল সংকট ছিল নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এবার সরাসরি সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির গবেষণা পরিচালক সুশান্ত গুপ্ত বলেন, রাশিয়া বিকল্প পথে তেল রপ্তানি করতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বাজার এখন ‘ব্যাকওয়ার্ডেটেড’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান দামের তুলনায় ভবিষ্যতের দাম কম হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই ব্যবসায়ীরা মূল্য নির্ধারণ করছেন। কারণ উচ্চমূল্যের কারণে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে তাদের ব্যয়ের ধরন বদলাতে শুরু করেছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইন চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। থাইল্যান্ড সরকার কর্মীদের হাফ হাতা পোশাক পরতে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখতে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের জ্বালানি ব্যবহার কমানো এবং বাড়ি থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জ্বালানি সংকটের দ্বিতীয় ধাক্কা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানতে পারে খাদ্য খাতে। ডিজেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন। এতে খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অধ্যাপক চেন সতর্ক করে বলেন, এশিয়ায় নতুন শস্য মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের কৃষক ইতোমধ্যে লোকসানের আশঙ্কায় চাষাবাদ কমানোর চিন্তা করছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে খাদ্য সংকট ও অনাহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।

