পুরোনো ও জরাজীর্ণ রেল ইঞ্জিন বদলে নতুন লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কিন্তু এ প্রকল্প ঘিরে ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে মাত্র দুই বিদেশি প্রকৌশলী নিয়োগে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুইজন বিদেশি সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এ ব্যয়কে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, দুইজন বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় যৌক্তিক নয়। তাদের মতে, এই অর্থ দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করলে রেল খাত দীর্ঘমেয়াদে আরও দক্ষ ও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। কমিশন বলছে, বিদেশি নির্ভরতার পরিবর্তে রেলওয়ের প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি দক্ষ জনবল গড়ে তোলা সম্ভব। এতে খরচও কমবে এবং সেবার মানও বাড়বে।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি দক্ষ জনবল কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মত দিয়েছে তারা।
প্রকল্পে ৯৩ জনমাস মেয়াদি পরামর্শ সেবা বাবদ ২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রস্তাব নিয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন। পরামর্শকের সম্মানি ও অন্যান্য ব্যয় বাজারদর অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রটোটাইপ পরিদর্শন, কারখানা পরিদর্শন ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাত একত্রে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পে আরও কিছু খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে টেস্টিং ফি, পরিবহন ব্যয়, বন্দর ব্যয়, ভ্রমণ ব্যয় এবং সমীক্ষা ব্যয়। প্রতিটি খাতের ব্যয় যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
লোকোমোটিভ প্রতিটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি (শুল্ক ও ভ্যাটসহ)। এ হিসাবের ভিত্তি এবং অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে তুলনামূলক ব্যয় বিশ্লেষণ চেয়েছে কমিশন। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছরের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ বাবদ ৪৬৯ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কমিশন বলছে, প্রকৃত চাহিদা, বাজারদর এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দরপত্র অনুযায়ী এসব ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশন মনে করে, দুইজন বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের চেয়ে দেশীয় জনবল তৈরি করা বেশি কার্যকর হবে। তাদের মতে, ২০ জন দেশীয় প্রকৌশলীকে জার্মানি বা উন্নত কোনো দেশে প্রশিক্ষণ দিলে তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া যাবে।
কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রশিক্ষিত দেশীয় প্রকৌশলীরা দীর্ঘ সময় রেল খাতে অবদান রাখতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে নতুন জনবলও তৈরি করতে পারবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, প্রকল্পে দুই বিদেশি প্রকৌশলীর ব্যয় ৫০ কোটি টাকার প্রস্তাব থাকলেও এটি চূড়ান্ত নয়। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ করা হবে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের প্রতিটি খাত নিয়েই আলোচনা চলছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় পুনর্গঠন করা হবে।
এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা দেবে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক। বাকি অর্থ সরকার বহন করবে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মতে, পুরোনো লোকোমোটিভের কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে গেছে এবং নির্ভরযোগ্যতা কমে গেছে। অনেক ইঞ্জিনের আয়ু শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ ছাড়া ট্রেন পরিচালনায় চাপ বাড়ছে। রেলওয়ের বর্তমান বহরের বড় অংশই পুরোনো হওয়ায় নিয়মিত সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও বাংলাদেশ রেলওয়ের মধ্যে এখন মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে ব্যয় কাঠামো ও বিদেশি নির্ভরতা বনাম দেশীয় সক্ষমতা নিয়ে। আসন্ন সভায় প্রকল্পের ব্যয় ও নকশা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

