আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণের ওপরও তিনি জোর দেন।
গত বুধবার (১৩ মে) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আয়–ব্যয়ের প্রাথমিক রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। রূপরেখাটি উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণের নির্দেশনা আসে। উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা অব্যাহত রেখে উৎপাদন ধরে রাখা, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকর করা এবং সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষাকে আনন্দমুখর করা এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদও দেওয়া হয়।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে মিতব্যয়িতা বজায় রেখে একটি কল্যাণমুখী বাজেট তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। বৈঠকে আরও বলা হয়, অপচয় কমিয়ে সরকারি ব্যয়কে কার্যকর করার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি আনতে হবে।
বৈঠকে বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। অর্থমন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সহায়তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর মতো কর্মসূচি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
এডিপির বড় অংশ যাবে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। এরপর বিদ্যুৎ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এডিপির অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে।
আগামী বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ আদায়ের দায়িত্ব থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় সংস্থাটির রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতির নজির রয়েছে। ফলে উচ্চ লক্ষ্য পূরণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণের অংশ হিসেবেও রাজস্ব বাড়ানোর ওপর চাপ রয়েছে।
আগামী অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিনিয়োগকে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করা এবং রাজস্ব আয়কে জিডিপির ১০ দশমিক ১৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী। মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা এপ্রিলে বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছায়।
আয়–ব্যয়ের কাঠামো অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এটি আগের তুলনায় আরও বেশি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকে আইসিটি ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া রেল ও নৌপরিবহন উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর নির্দেশনাও আসে।
অর্থমন্ত্রী জানান, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিকাশে সৃজনশীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কর নেট সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

