রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিনা হোসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সারাদিন অফিসের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে তিনি বাসায় ফেরেন কিন্তু বিশ্রামের সুযোগ মিলছে না। কারণ রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস চুলায় ঠিকমতো আসছে না। কখনো একেবারেই নেই, আবার কখনো খুবই কম চাপ থাকে। ফলে রাত গভীর না হওয়া পর্যন্ত রান্না শুরু করা সম্ভব হয় না।
এই পরিস্থিতি এখন শুধু সেলিনা হোসেনের একার নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। অনেক সময় গভীর রাতেই গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়। এতে বিপাকে পড়ছেন কর্মজীবী ও গৃহিণীরা।
সেলিনা হোসেন বলেন, সকাল ও দুপুরে বাইরে খেতে হয়। সারাদিন কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে দ্রুত রান্না শেষ করে বিশ্রাম নিতে চান তিনি। কিন্তু গ্যাস না থাকায় অপেক্ষা করতে হয় গভীর রাত পর্যন্ত। তার ভাষায়, অনেক দিন এমনও গেছে দুপুরে ছুটির দিনেও রান্না করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। বুধবার দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে মোট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ৯৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট। গত বছর একই দিনে উৎপাদন ছিল ১১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
গ্যাস সংকটের কারণে ভোগান্তির কথা জানান মিরপুরের বাসিন্দা গৃহিণী হোসনে আরা। তিনি বলেন, সকাল থেকে চুলায় গ্যাস থাকে না, থাকলেও খুবই কম জ্বলে। রান্না করা যায় না। রাত ১২টা থেকে ১টার দিকে চাপ কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এ সমস্যা কবে শেষ হবে তা তিনি জানেন না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও মিরপুর ছাড়াও বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনের বেলা রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাড্ডার বাসিন্দা মো. ফাহাদ বলেন, দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। সন্ধ্যাতেও পাওয়া যায় না। শুধু গভীর রাতে গ্যাস আসে। এতে তাদের দৈনন্দিন রান্নাবান্না ও খাবারের সময়সূচি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে।
সরকারি পাইপলাইনের দুই চুলার গ্যাসের বিল বর্তমানে ১০৮০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত রান্না করা সম্ভব না হওয়ায় এই বিল এখন অনেক গ্রাহকের কাছে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাত গভীর না হওয়া পর্যন্ত চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। এতে মাস শেষে খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
সরবরাহ পরিস্থিতির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যেখানে চাহিদা প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। একইভাবে সার উৎপাদন খাতে চাহিদা ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ মিলছে ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট। গুরুত্বপূর্ণ এসব খাতে ঘাটতির কারণে চাপ বাড়ছে মূলত আবাসিক খাতে, ফলে ভোগান্তি আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে এলপি গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য ১ হাজার ৯৪০ টাকা। তবে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার অসামঞ্জস্যের কারণে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। ফলে মাসিক খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকার কাছাকাছি। মিরপুরের বাসিন্দা জসীম উদ্দিন বলেন, প্রতি মাসে নিয়মিত বিল দিতে হয়। কিন্তু গ্যাস পাওয়া যায় গভীর রাতে। তখন রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার প্রশ্ন, “এই সময়ে গ্যাস দিয়ে আসলে কী করব?”

