বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জনই যথেষ্ট নয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রয়োজন দক্ষ সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন এবং কার্যকর ডিজিটাল গভর্নেন্স। বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের সমন্বয়ই আগামী অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেবল আয়–ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত রূপরেখা।
নতুন জাতীয় বাজেট এমন সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এই বাস্তবতায় বাজেটকে শুধু ব্যয় ও রাজস্বের দলিল হিসেবে না দেখে, অর্থনীতিকে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিনিয়োগবান্ধব করার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করার দাবি উঠছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যয় মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। উন্নত অর্থনীতিতে এই হার সাধারণত ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকে। ফলে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়ের চাপে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাপ, রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং গুদাম ব্যবস্থার দুর্বলতা রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে। তাই ২০২৬–২৭ বাজেটে এই খাতে আলাদা কৌশলগত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
ঢাকা–চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোর, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দর সংযোগ, শুকনো বন্দর, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বহুমাধ্যম পরিবহন কাঠামোর উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ দরকার। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য সড়কপথে পরিবহন হওয়ায় ব্যয় ও সময় দুইই বাড়ছে। বাজেটে রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারে প্রণোদনা দিলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চলের জন্য পৃথক লজিস্টিক জোন গঠনের প্রস্তাবও গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে, নতুন বাজেটে ডিজিটাল প্রশাসন ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হচ্ছে। যদিও ব্যবসা নিবন্ধন, ভ্যাট, কর, শুল্ক ও লাইসেন্স সংক্রান্ত অনেক সেবা এখন ডিজিটাল হয়েছে, তবুও এগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সমন্বিত নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার কারণে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে সরকারি সেবাগুলোকে একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ডিজিটাল প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হলে প্রশাসনিক ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কর আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি হ্রাস পাবে।
বর্তমানে দেশের রাজস্ব–মোট দেশজ উৎপাদন অনুপাত প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই করহার বাড়ানোর পরিবর্তে ডিজিটাল কর প্রশাসন জোরদার করাকে এখন বেশি কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কর নিরীক্ষা, ই-চালান ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

