জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে তিন বাহিনীর আধুনিকায়নে বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধ সরঞ্জাম, আধুনিক আকাশযান, ড্রোন ও নৌ সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই বরাদ্দ মূলত সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনার অংশ। বর্তমানে অর্থ বিভাগ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৩৯ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা করা হয়। এর আগের অর্থবছরে মোট ব্যয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।
গত ২৩ এপ্রিল মিরপুর সেনানিবাসে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশ্য যুদ্ধ করা নয়, বরং যুদ্ধ এড়িয়ে চলা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন কঠিন। দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় নৌ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নকে সময়ের অপরিহার্য দাবি বলে উল্লেখ করেন।
দেশের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে বিমানবাহিনীর জন্য নেওয়া হয়েছে বিস্তৃত আধুনিকায়ন পরিকল্পনা। আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাহিনীটির সক্ষমতা বাড়াতে ১২ হাজার ২৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় বহুমুখী যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ভিআইপি পরিবহনের জন্য বিশেষ হেলিকপ্টার কেনার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি, দূরপাল্লার রাডার এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, উন্নত রাডারসংবলিত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম যুক্ত হলে বিমানবাহিনী আঞ্চলিক বাস্তবতায় আরও কার্যকর শক্তিতে পরিণত হবে। দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে পরিকল্পনায়। দক্ষ বৈমানিক, প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান গড়ে তোলার মাধ্যমে বিমানবাহিনীকে ধাপে ধাপে আরও স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীকে আরও আধুনিক ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে উন্নত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশে এক হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবও রয়েছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে দেশীয় জাহাজ নির্মাণশিল্প ব্যবহার করে চারটি বড় টহল জাহাজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ খাতে প্রায় ৭৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাবমেরিন ঘাঁটি পেকুয়ার জন্য কাটার সাকশন ড্রেজার, ভিস্যাট ও প্রশিক্ষণ সিমুলেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৫৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। এর আওতায় আইএফএফ সিস্টেম স্থাপনে ১২৬ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নৌবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রশাসনিক ভবন, বহুতল আবাসিক ভবন, মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল নির্মাণে প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে বানৌজা ঈসা খাঁ, বিএন ডকইয়ার্ড, বানৌজা তিতুমীর ও বানৌজা পতেঙ্গায় উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

