দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। আর্থিক খাতে দুর্বলতা স্পষ্ট। বেসরকারি বিনিয়োগে গতি নেই বললেই চলে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণও সন্তোষজনক নয়। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ অব্যাহত। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বড় চাপ নিয়ে নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক ব্যয়সীমা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, এবার সরকার এমন একটি বাজেট প্রণয়নের পথে হাঁটছে যেখানে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে বড় অঙ্কের ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক শৃঙ্খলা ও সংস্কার—দুই চাপ একসঙ্গে সামাল দেওয়ার চেষ্টা থাকছে আসন্ন বাজেটে।
তবে কৃচ্ছ্রসাধনের এই নীতির মধ্যেও কিছু খাতে জনকল্যাণমূলক ব্যয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার মতো ব্যয় আন্তর্জাতিক চাপ পুরোপুরি অনুসরণ না করেও অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বিবেচনায় পরিচালন ব্যয়ের কাঠামোতেই এসব খাতে বরাদ্দ বজায় রাখার পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত আস্থা পুনর্গঠন। তাঁর মতে, সরকারকে দেখাতে হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা আছে, ব্যবসায়ীদের কাছে বিনিয়োগের নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছাতে হবে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আশ্বস্ত করতে হবে যে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বাজেটে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান সহায়তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তরুণদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করার উদ্যোগগুলো অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।
জানা গেছে, আগামী ১১ জুন দুই হাজার ছাব্বিশ–সাতাশ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই ব্যয়কে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে টানা কয়েক বছর লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা এবং কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার কারণে এত বড় রাজস্ব অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।
নীতিনির্ধারণে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এবারের বাজেটকে প্রচলিত অর্থে সম্পূর্ণ সংযমী রাখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত দৃশ্যমান করার চাপ রয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের বোঝা না বাড়ানোর রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে ব্যয় কমিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে পুরোপুরি যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, আবার অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগও সীমিত।
আসন্ন বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে অর্থনীতিকে আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানো। সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বাজেট কাঠামোর প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বাজেটের কাঠামো উপস্থাপন করা হয়। জনসম্পৃক্ততা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্বনীতির কয়েকটি বিষয়ে সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাজেটে ১১ জুনের আগে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
এবার বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি ঋণ ও প্রকল্প সহায়তার ওপর নির্ভরতা আবারও বাড়ছে।
উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ যাবে পরিবহন, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ফেরাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. এম কে মুজেরী বলেন, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখে প্রবৃদ্ধির পথে ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, বাজেটে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা না বাড়িয়ে বড় ব্যয় কাঠামো বজায় রাখা হলে ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা বাড়বে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হতে পারে, যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে।
ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, বিনিয়োগের আস্থা ফেরানো এখন সবচেয়ে জরুরি। নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তবে জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ, ব্যাংক ঋণ ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এখনো ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে রেখেছে। তাই বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব বার্তা স্পষ্টভাবে থাকা প্রয়োজন।

