শ্রম আইন বাস্তবায়ন, কর্মপরিবেশ তদারকি এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) কিন্তু শ্রমিক সুরক্ষার এই দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানটিই এখন নিজ অবকাঠামোর সংকটে কার্যত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
ঢাকা জেলা অফিসসহ দেশের ১১টি জেলায় ডিআইএফইর নিজস্ব কোনো ভবন নেই। এসব এলাকায় ভাড়া করা আবাসিক ভবনে অপ্রতুল জায়গায় চলছে অফিস কার্যক্রম। ফলে প্রতিনিয়ত অফিস স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা দৈনন্দিন কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করছে। এতে শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, শ্রমিক সুরক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডিআইএফইর উপ-মহাপরিদর্শক মো. আরিফুজ্জামান জানান, ঢাকা সহ ১১টি জেলায় তাদের নিজস্ব ভবন নেই। এমনকি প্রধান কার্যালয়ও নিজস্ব ভবনে নয়। তিনি বলেন, এ অবস্থায় কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। শ্রম আদালতও ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর ডিআইএফইর দায়িত্ব ও পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়লেও সেই অনুযায়ী আধুনিক ও স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। একটি সুপরিকল্পিত ও সুবিধাসম্পন্ন সদর দপ্তর ও জেলা অফিস থাকলে শ্রম আইন বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতো এবং প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ত।
ডিআইএফইর ঢাকা কার্যালয়ের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন নেই। রাজশাহীতে একটি মাত্র স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। কিন্তু দূরত্বের কারণে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো শ্রমঘন এলাকার শ্রমিক ও কারখানা সংশ্লিষ্টরা এর সেবা পাচ্ছেন না। তার মতে, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় সব কার্যক্রম এক ছাদের নিচে আনা জরুরি।
অবকাঠামো সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলেও জানা যায়। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফেনী, রাঙ্গামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নওগাঁ, জামালপুর, খুলনা ও সিলেটসহ একাধিক জেলায় ডিআইএফইর নিজস্ব ভবন নেই।
সূত্র জানায়, দেশে আউটসোর্সিং নির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন। এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ফি দিলেও কার্যকর মনিটরিং না থাকায় সরকার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক শ্রমিক শ্রম আইনের পূর্ণ সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যার ফলে শোষণ ও অসম সুবিধার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে রাজশাহীর একমাত্র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দূরত্বের কারণে প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলো এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দূরত্ব, সময় ও ব্যয়ের কারণে মালিক ও শ্রমিকরা প্রশিক্ষণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছয়টি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ বা স্থানীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও সীমিত হয়ে পড়বে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল থাকবে।
ডিআইএফই সূত্র আরও জানায়, দেশে এখনো নিজস্ব কোনো স্বীকৃত কারখানা মান নির্ধারণ বা সনদ প্রদান ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি ব্যয়বহুল সনদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ বাড়াচ্ছে। এছাড়া ডিআইএফইর ব্যবহৃত বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। বিশেষ করে লিমা নামের ব্যবস্থায় তথ্য একাধিকবার ইনপুট দিতে হয়, ফলে তথ্যের অমিল দেখা দেয় এবং ডাটার নির্ভরযোগ্যতা কমে যায়।
এ অবস্থায় একটি কেন্দ্রীয়, সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। এতে সব সিস্টেম একীভূত হবে, স্বয়ংক্রিয় সনদ প্রদান ব্যবস্থা চালু করা যাবে এবং আউটসোর্সিংসহ বিভিন্ন খাতের কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে।
ডিআইএফইর আরেক উপ-মহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত কারখানাকেন্দ্রিক হলেও দেশে দোকান, মার্কেট ও রেস্তোরাঁসহ বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখনো নিয়মিত তদারকির বাইরে রয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, দোকান ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা জনবল থাকলেও মানসম্মত পদ্ধতি ও চেকলিস্টের অভাবে কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসসহ উৎপাদনমুখী শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শ্রমিক সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর তদারকি কাঠামো এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

