দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কর কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ এবং স্থিতিশীল নীতিমালা নিশ্চিত করেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে চায় সরকার।
গতকাল শনিবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত প্রাক-বাজেট সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপের আয়োজন করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার। এতে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। আলোচনায় বক্তারা নতুন এক ‘সামাজিক চুক্তি’র প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাদের মতে, নাগরিকরা যেন কর দেওয়ার বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সেবা ও সুবিধার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
উপদেষ্টা তিতুমীর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবল কারিগরি সমাধানের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা কাজ করেছে। তিনি জানান, সরকার এখন প্রযুক্তিনির্ভর কিন্তু জবাবদিহিমূলক রাজস্ব প্রশাসনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর মাধ্যমে করদাতাদের হয়রানি কমানো এবং বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য করনীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে করের আওতার বাইরে থাকা খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি স্বীকার করেন, কর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও ‘ফেসলেস’ করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করদাতাদের হয়রানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করা। তিনি জানান, চলতি বছর ইতোমধ্যে ৪৫ লাখ ই-রিটার্ন জমা পড়েছে। ভবিষ্যতে কাগজবিহীন কাস্টমস ব্যবস্থা ও ঝুঁকিভিত্তিক অডিট পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ সীমিত থাকে।
সংলাপে বর্তমান কর সংস্কৃতির সমালোচনা করেন সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, দেশে অনেক ব্যবসায়ী কর দিতে অনাগ্রহী, কারণ তারা হয়রানির আশঙ্কা করেন এবং করের অর্থ কোথায় ব্যয় হয় সে বিষয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা দেখতে পান না। তিনি আরও বলেন, একই করদাতার ওপর বারবার চাপ না বাড়িয়ে করের জাল বিস্তৃত করা প্রয়োজন। বিলাসবহুল গাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ বেশ কিছু খাত এখনও কার্যকরভাবে করের আওতায় আসেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিশ্বব্যাংক-এর বাংলাদেশ ও ভুটানের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. গেইল মার্টিন সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজস্ব কাঠামো তার সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে এলেও সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য চাপ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভ্যাট অব্যাহতির কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তাই কর অব্যাহতির তালিকা যৌক্তিক করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর করের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, কর ফাঁকি এবং হয়রানির ‘ত্রিমুখী সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, রাজস্ব আদায় শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি সামাজিক অগ্রগতিরও সূচক। নাগরিকদের জানতে হবে তাদের করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত না হলে দেশে কর দেওয়ার সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

