বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি সংকটের এক জটিল ও বহুমাত্রিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। শিল্প উৎপাদন, কৃষি ব্যবস্থা, রফতানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও এই চাপে রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ফলে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে বাংলাদেশকে একদিকে সরবরাহ ঘাটতি, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের দ্বৈত চাপে পড়তে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যেখানে অনেক দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে এই হার ৫ শতাংশেরও নিচে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তার পূর্ণ ব্যবহার হয়নি।
এ পিছিয়ে থাকার মূল কারণ প্রযুক্তি নয়, বরং নীতিগত, আর্থিক, কর ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানিতে ২৮ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক, ভ্যাট ও কর আরোপ করা হচ্ছে। ব্যাটারি স্টোরেজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতেও উচ্চ কর বিদ্যমান। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি খাত আমদানি থেকে উৎপাদন পর্যন্ত নানা ধাপে ভর্তুকি ও নীতিগত সুবিধা পাচ্ছে। ফলে দুই খাতের মধ্যে স্পষ্ট বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামে শূন্য বা স্বল্প শুল্ক, কর ছাড় এবং সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। অনেক দেশে ব্যাটারি ও জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর কর প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাটারি আমদানিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক থাকায় খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রধান প্রতিবন্ধকতা: নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একাধিক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- উচ্চ আমদানি শুল্ক ও কর
- সহজ ঋণের অভাব
- অর্থায়নে জটিলতা ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া
- নেট মিটারিং ব্যবস্থায় বিলম্ব
- পৃথক নীতিমালার অভাব
- স্মার্ট গ্রিড ও ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা
- মার্চেন্ট পাওয়ার নীতির অনুপস্থিতি
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা: প্রথম ছয় মাসে সংকট মোকাবিলা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার
- ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে নেট মিটারিং চালু
- একক সেবা কেন্দ্র চালু
- শিল্প ও বাণিজ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশেষ প্রণোদনা
- স্থগিত ৩১টি সোলার প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন
- রুফটপ সোলারের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ
- টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী কমিশনে রূপান্তর
- মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা: পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
- দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা চালু
- সৌর প্রকল্পে কর অবকাশ
- কৃষিতে সোলার পাম্প ব্যবহার বৃদ্ধি
- ১৭ লাখ ডিজেল সেচ পাম্পকে সৌর পাম্পে রূপান্তর
- সরকারি ভবনে রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক
- ভবন নকশায় সৌর অবকাঠামো বাধ্যতামূলক করা
- হাইব্রিড সোলার ব্যবস্থার প্রসার
- দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি
- গ্রিড ও অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই জ্বালানি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
- ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন
- অফশোর ও অনশোর বায়ুবিদ্যুৎ উন্নয়ন
- ভাসমান ও নদীতীরবর্তী সৌর প্রকল্প সম্প্রসারণ
- জ্বালানি সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন
- সম্পূর্ণ ডিজিটাল জ্বালানি ব্যবস্থাপনা
- আঞ্চলিক জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ
- গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নয়ন
সম্ভাব্য সুফল: এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের জন্য বহুমাত্রিক লাভ হবে।
- জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমবে
- বৈদেশিক মুদ্রার চাপ হ্রাস পাবে
- শিল্প উৎপাদন ব্যয় কমবে
- রফতানি সক্ষমতা বাড়বে
- ভর্তুকির চাপ কমবে
- প্রতি মেগাওয়াটে ২০ থেকে ২৫ জন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
- নতুন উদ্যোক্তা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও। সঠিক নীতি ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সাশ্রয়ী, স্বনির্ভর ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারে। প্রশ্ন এখন একটাই—বাংলাদেশ কত দ্রুত এই রূপান্তর সম্পন্ন করতে পারে।

