রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আসন্ন বাজেটে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর আরোপ না করার দাবিতে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা। গতকাল রবিবার (১৭ মে) রাজস্ব ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণ সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা কিস্তি দিয়ে মোটরসাইকেল কিনে পাঠাও-এ চালান। সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনকারী। তিনি কলেজে পড়েন, আর তার ছোট দুই বোন স্কুলে যায়। বাবা-মা দুজনই অসুস্থ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “মোটরসাইকেল কেনার সময়ই তো ভ্যাট-কর দিয়েছি। আবার কেন কর দিতে হবে? ধনীদের দিকে কি সরকার তাকায় না? অল্প আয়ের মানুষের ওপরই সব চাপ কেন?” সাইফুল আরও বলেন, আগামী বাজেটে মোটরসাইকেলে নতুন কর বসলে কিস্তি চালানো ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, “অল্প আয়ের মানুষের ওপরই যত অত্যাচার, জুলুম।”
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, বাড়ির মালিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ালেও অনেক ক্ষেত্রে কর ফাঁকি দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একইভাবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয় না। বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে কর ফাঁকি চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে গণপরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে। আবার বাণিজ্যের আড়ালে বড় অঙ্কের অর্থ পাচার হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে বিনিয়োগে গতি নেই। শিল্প খাতে মন্দা চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকট অর্থনীতির চাপ আরও বাড়িয়েছে। একই সময়ে সাধারণ মানুষের আয় কমছে, আর সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাজেটের আকার প্রতিবছর বাড়লেও অর্থ সংগ্রহের চাপও বাড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, প্রভাবশালীরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অনেক সময় করের আওতার বাইরে থাকেন। তার মতে, অতীতে দেখা গেছে প্রভাবশালীদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব এলেও তা পরে বাতিল হয়েছে। এমনকি বাড়ির মালিকদের ওপর কর আরোপের বিধানও চূড়ান্ত বাজেটে বাদ পড়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ সহজ পথ হিসেবে সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট ও কর আরোপ করে লক্ষ্য পূরণ করে। এতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, কিন্তু ধনীরা অনেক সময়ই সুবিধা পেয়ে যান।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ধারাবাহিকভাবেই বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্য বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপরই করের চাপ বেশি পড়ে। তার মতে, ভ্যাটের পরিবর্তে আয়কর বাড়ানো উচিত ছিল, তবে কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি না নিয়ে সহজ পথে যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট অর্থায়নের অর্ধেকের বেশি সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর। এবার তাদের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এই লক্ষ্য পূরণে শেষ পর্যন্ত চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিজাত এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ির মালিক কর ফাঁকি দেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এসব বাড়ির ওপর কর আরোপের প্রস্তাব এলেও প্রভাবশালীদের চাপের মুখে তা বাতিল হয়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দাবি থাকলেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিলিয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয় না। কোটি টাকার বেশি মূল্যের গাড়ি আমদানিতে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি হয় বলেও তথ্য রয়েছে। পরিবারে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি থাকা অনেক ব্যক্তি আয়কর রিটার্নে সঠিক তথ্য দেন না।
এদিকে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মতো সাধারণ পরিবহনে নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম না কমায় গণপরিবহনের ব্যয়ও বেড়েছে। বাণিজ্য খাতে অর্থ পাচারের বিষয়টিও উঠে এসেছে আলোচনায়। অভিযোগ রয়েছে, বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে রাজস্ব বকেয়া ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বছরের পর বছর অনাদায়ী রয়ে গেছে।
অন্যদিকে ছোট দোকানদারদের ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আসন্ন বাজেটে ধনীদের সারচার্জ বাতিল করে সাধারণের ওপর সম্পদ কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে, যা ফ্ল্যাট ও জমির দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র জানায়, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কমছে না। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নতুন কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। নাটক ও সংগীতানুষ্ঠানের টিকিটের দাম বাড়ার আশঙ্কাও আছে। চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য আমদানিতে কর অব্যাহত থাকায় বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা কম।
আসন্ন বাজেটে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলে বছরে ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এই খবর প্রকাশের পর মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবিতে অনেকেই রাস্তায় নামেন।
বাইকারদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দিয়ে মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেওয়া এ কে এম ইমন বলেন, ভারতে যে বাইক ১ লাখ টাকায় পাওয়া যায়, বাংলাদেশে তার দাম ৩ লাখ টাকা। তার মতে, মোটরসাইকেল এখন সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় বাহন। অনেকেই রাইড শেয়ারিং বা পণ্য ডেলিভারি করে দৈনিক ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করেন। নতুন কর আরোপ হলে তাদের জীবিকা সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, এতে দেশের লাখো ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইঙ্গিত দেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় কর-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে নতুন কর আরোপ সাধারণ মানুষের জন্য আরও কষ্টকর হবে। তার মতে, ব্যবসা ব্যাহত হলে জিনিসপত্রের দাম কমবে না, বরং আয়ও কমে যাবে।

