বাংলাদেশের বাড়তে থাকা কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে এখনই কার্যকর সংস্কার জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত সংরক্ষণবাদী নীতি দেশের বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যাচ্ছে।
গতকাল সোমবার ঢাকায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট- স্পেশাল ফোকাস: এ বিজনেস এনভায়রনমেন্ট দ্যাট ডেলিভারস জবস’ শীর্ষক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ধ্রুব শর্মা। তিনি বলেন, দ্রুত বাড়তে থাকা শ্রমশক্তিকে উৎপাদনমুখী খাতে যুক্ত করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা কমানো, প্রয়োজনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির পথে থাকা বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রায় ৪০ শতাংশ যুব বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছাড়া নতুন কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয় এবং টেকসই কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য কমানোও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
ড. সাত্তার বলেন, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের প্রায় ৬০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার ২০২০ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই অর্থনৈতিক মডেলকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করা প্রয়োজন।
রেমিট্যান্সে সরকারের অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা আগেই বেড়েছে।
সভায় দেশের কর প্রণোদনা কাঠামোর অসামঞ্জস্যও তুলে ধরা হয়। ড. সাত্তার বলেন, তৈরি পোশাক খাত এখনও অন্যান্য শিল্পের তুলনায় কম করপোরেট কর সুবিধা পাচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্কের কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি থাকছে। এতে রপ্তানি বহুমুখীকরণের গতি কমে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের ‘ফ্রন্টিয়ার ফার্ম’গুলো প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি ও ৭৫ শতাংশ রাজস্ব আয় তৈরি করলেও মোট কর্মসংস্থানে তাদের অবদান মাত্র ১৫ শতাংশ। বক্তাদের মতে, এটি দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্যের স্পষ্ট চিত্র।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, কম মজুরির শ্রম ও অতিরিক্ত সংরক্ষণবাদের ওপর নির্ভরশীল প্রবৃদ্ধি মডেল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বহুমুখী অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। সেখানে মানসম্মত কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের বড় অংশের চাকরি এখনও অনানুষ্ঠানিক, কম বেতনের এবং অনিশ্চিত। নতুন শিল্পকে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার বিকৃতি এড়াতে সুরক্ষা নীতির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা জরুরি। ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বেসরকারি খাতের জন্য সাশ্রয়ী অর্থায়নের বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিচালক টি আই এম নুরুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর ও রাজস্বনীতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘন ঘন নীতিপরিবর্তন এবং হঠাৎ সম্পূরক শুল্ক আরোপ ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ও কর রাজস্বও কমে যাচ্ছে।
পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার করতে বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্যনির্ভর নীতিনির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

