চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ৬৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বাজেট সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নিশ্চিত হয়েছে। বাকি প্রায় ৪৭৫ কোটি ডলার জুনের মধ্যে পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকলেও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি।
মূল বাজেট প্রণয়নের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলার বা ৪৬ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতায় জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার অতিরিক্ত সহায়তা চায়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ২০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে আরও ১০০ কোটি ডলার জরুরি ঋণ সহায়তার অনুরোধ করা হয়। তবে এসব ঋণের শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ইতোমধ্যে ২৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা অনুমোদন করেছে এবং আরও ৭৫ কোটি ডলারের সহায়তা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২৪ মে এ বিষয়ে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে ২৫ কোটি ডলার এবং জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে ৫০ কোটি ডলারের সহায়তা পাওয়ার আলোচনা চলছে। এসব অর্থ জুনের মধ্যে ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আগের দুই কিস্তির ১৩০ কোটি ডলারের পাশাপাশি নতুন করে চাওয়া ২০০ কোটি ডলার জুনের আগে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের কাছে চাওয়া ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে আপাতত ৫০ কোটি ডলার নিয়ে আলোচনা চলছে। আগের ১২০ কোটি ডলারের ক্ষেত্রেও শর্তসংক্রান্ত জটিলতা রয়ে গেছে।
প্রত্যাশিত বাজেট সহায়তা না এলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে আসন্ন বড় বাজেট পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
ঋণ সহায়তা পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের আরোপ করা একাধিক কঠোর শর্তে অস্বস্তিতে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাংক খাত ও রাজস্ব খাত সংস্কার ঘিরে এসব শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে বলেছে দাতারা। এ ধারার কারণে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দাতাদের আপত্তি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। তবে এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। এ কারণে রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরে নতুন সরকার ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক চাইছে, আগামী জুনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা হোক।
অর্থ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাত সংস্কারে সরকারের অবস্থান নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধনকে তারা আর্থিক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এ অধ্যাদেশটি মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শেই তৈরি হয়েছিল।
শুধু ব্যাংক খাত নয়, রাজস্ব খাত সংস্কারেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ভ্যাটের অভিন্ন ১৫ শতাংশ হার চালু, কর অব্যাহতি হ্রাস, টার্নওভার কর প্রবর্তন এবং করপোরেট কর পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি চায় দাতারা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপরও তারা জোর দিচ্ছে। তাদের মতে, সর্বজনীন ভর্তুকি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তাই দরিদ্রদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে তা বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। বাকি রয়েছে আরও ১৮৬ কোটি ডলার।
তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারে অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন গত মার্চে ঢাকা সফরে এসে সরকারের কাছে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
গত মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল অতিরিক্ত ঋণ এবং চলমান কর্মসূচির কিস্তি ছাড় নিয়ে আলোচনা করে। এরপর কয়েক দফা আলোচনা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কর্মকর্তারা মনে করছেন, অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তা ছাড়ের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাজেট সহায়তা কেন এখন অপরিহার্য:
রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া এবং বৈদেশিক প্রকল্প ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার কারণে বাজেট সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, চলতি পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক চাহিদা পূরণে এই সহায়তা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত প্রায় ৩১৫ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্প ঋণ নির্দিষ্ট খাতে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু বাজেট সহায়তার অর্থ সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করতে পারে, যা এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) উন্নয়ন সহযোগীদের বৈদেশিক প্রকল্প ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় উভয়ই কমেছে। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ, প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। এর আগে গত অর্থবছরের পুরো সময়ে ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ফলে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে ঘাটতি।
বাজেট ঘাটতি পূরণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে মোট এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই বড় অংশ নেওয়া হচ্ছে। অর্থবছরের ১২ মাসে ব্যাংক থেকে যত ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তার প্রায় পুরোটা ৯ মাসেই নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে গত এপ্রিলে সরকার ৪৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে আগের ঋণের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুত অর্থ আটকে থাকার প্রধান কারণ সরকারের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে ধীরগতি। তাঁর মতে, সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় সীমিতই থেকে যাবে।
তিনি আরো বলেন, বৈদেশিক সহায়তার বিকল্প হিসেবে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বেশি ঋণ নেওয়া হলে সুদের হার আরও বেড়ে যেতে পারে। বর্তমানে সুদের হার এমনিতেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, যা আগে থেকেই ধীর, আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে সরকারের সামনে ব্যয় সংকোচন ছাড়া বিকল্প সীমিত থাকবে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি আমদানিতে ডলার ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারলে করদাতাদের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করে অর্থনীতির দক্ষতা বাড়ানো যাবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার এবং মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের সুশাসন ও রাজস্ব সংস্কারসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারে কার্যকর অগ্রগতি না হলে চলমান অর্থনৈতিক চাপের স্থায়ী সমাধান আসবে না।
সিভি/এম

