দেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ মডেলের খসড়া ইতোমধ্যে নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর মাধ্যমে প্রায় ২৩ মাস পর আবারও সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দরপত্রের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে। দরপত্র প্রকাশের পর জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা দেশে ‘রোড শো’ আয়োজন করবে বলেও জানা গেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী রোববার আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, এবারের দরপত্র আগের তুলনায় আরও আকর্ষণীয় করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়, তথ্য-উপাত্তের দাম এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিকে সর্বোচ্চভাবে আকৃষ্ট করাই মূল লক্ষ্য।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে জ্বালানি খাতে একাধিক উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ছিল স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, কূপ সংস্কার এবং অফশোর ও অনশোর পিএসসি চূড়ান্ত করা। এরই ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যেই অফশোর মডেল পিএসসি চূড়ান্ত করে নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তির পর ১ জুন থেকে প্রমোশনাল প্যাকেজ বিক্রি শুরু হবে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলো জরিপ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবে।
পেট্রোবাংলা–এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমোশনাল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মিট দ্য প্রেস, গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, বিদেশি দূতাবাসে চিঠি পাঠানো এবং রোড শোর পরিকল্পনা রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, আগের মডেলে বিদেশি কোম্পানির যেসব আপত্তি ছিল, সেগুলো সংশোধন করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের দাম, পাইপলাইন ব্যয়, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল এবং মূল্য নির্ধারণের সময়সীমা নিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গত ৭ মে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই নতুন এই কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের মার্চে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সময়সীমা প্রথমে ছয় মাস থাকলেও পরে আরও তিন মাস বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি তথ্য-উপাত্ত কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউই দরপত্র জমা দেয়নি। পরবর্তীতে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে একটি কমিটি গঠন করে পেট্রোবাংলা। ওই কমিটি বিদেশি কোম্পানিগুলোর আপত্তি চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ছিল গ্যাসের দাম, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, পাইপলাইন ব্যয় এবং অফশোর ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ‘অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’-এ এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। উদ্দেশ্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধি করা। নতুন কাঠামো অনুযায়ী গ্যাসের মূল্য পাঁচ বছর পরপর নির্ধারিত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমার মধ্যে সমন্বয় করা হবে। দাম নির্ধারণ পদ্ধতিও পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করে মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
আগে যেখানে উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েলের ভিত্তিতে দাম নির্ধারিত হতো, সেখানে নতুন ব্যবস্থায় তিন মাসের গড় ব্রেন্ট মূল্যের ১১ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে। এতে সর্বনিম্ন ৭০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলের ভিত্তি ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অনুসন্ধান পর্যায়ে কোম্পানিগুলোকে আগের মতো ৫০ শতাংশ এলাকা ছাড়তে হবে না। নতুন নিয়মে মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা ত্যাগ করলেই চলবে।
শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশগ্রহণও কমানো হয়েছে। ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ এখন দরদাতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। সংশোধিত চুক্তিতে অবকাঠামো বিনিয়োগের পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুযোগও রাখা হয়েছে।
এছাড়া বৈশ্বিক সুদহার নির্ধারণে লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের পরিবর্তে সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির সুপারিশে এসব পরিবর্তন আনা হয় এবং আইন মন্ত্রণালয় তা পর্যালোচনা করে।
সমুদ্রসীমা নিয়ে অতীত ইতিহাসে দেখা যায়, ২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হয়। তবে তখন দরপত্র আহ্বান হয়নি। এরপর ২০২৩ সালে নতুন পিএসসি চূড়ান্ত করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ৫৫টি কোম্পানিকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর আগের সর্বশেষ দরপত্র হয়েছিল ২০১৬ সালে।
২০২৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ১৫টির বেশি আন্তর্জাতিক কোম্পানি অংশ নেয়। সেখানে ১২ হাজার কিলোমিটার এলাকায় ভূকম্পন জরিপের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বঙ্গোপসাগরে মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে, যার মধ্যে গভীর সমুদ্রে ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক। অতীতে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানি এসব ব্লকে কাজ শুরু করলেও নানা কারণে তারা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সংশোধিত পিএসসি কার্যকর হলে বিদেশি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান জরুরি হলেও এটি বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিদেশি কোম্পানির আস্থা ফেরাতে শর্তগুলো যৌক্তিকভাবে সাজানো জরুরি, না হলে আগের মতো ব্যর্থতার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

