অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক চাপ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভার—এই তিন বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সরকারকে তাদের প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এবারের বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের সক্ষমতা ও অঙ্গীকার যাচাইয়ের বড় পরীক্ষা।
রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট সংলাপে বক্তারা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রয়োজনের প্রতিফলন ঘটিয়ে বাজেট প্রণয়ন না হলে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এ সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, আসন্ন বাজেটে নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম ও শহরের নাগরিক সুবিধার বৈষম্য কমিয়ে আনার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ৮০ হাজার পরিবার এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। ধাপে ধাপে ‘এক নাগরিক এক কার্ড’ নীতিও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
সংলাপের সভাপতি ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারকে এমন এক অর্থনীতির দায়িত্ব নিতে হয়েছে যা আগে থেকেই চাপে ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ঋণের শর্ত এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপ!
তার মতে, গত কয়েক মাসে সরকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বাজেট যদি পুরোনো ধাঁচের পুনরাবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জমি দখলের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মানুষের আয় ও সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে করনীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জনগণ যে পরিমাণ কর দেয় এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ জমা পড়ে—এই দুইয়ের বড় ব্যবধানই দুর্নীতির প্রতিফলন। এই সমস্যা দূর না হলে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান, আগামী মাসে তাদের দল বিকল্প বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। তার অভিযোগ, কর আদায়ে জড়িত কিছু ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকির পথ দেখান। এ পরিস্থিতি বদলাতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় এবারের বাজেট মূলত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর বাজেট। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মী বলেন, বাজেটের আগে নতুন করনীতির আলোচনা দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়। তিনি গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামান্য সম্পদের ওপর কর পুরোপুরি মওকুফের প্রস্তাব দেন।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। এজন্য সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
উন্মুক্ত আলোচনায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি শুল্ক কমানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম আর না বাড়ানোর পরামর্শও দেন তিনি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ এবং জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব।

