একসময় দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও জনপ্রিয় বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত ছিল সঞ্চয়পত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয় সংকোচনের কারণে এখন অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ না করে আগের সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ চালাচ্ছেন।
ফলে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে ঋণাত্মক অবস্থায় চলে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় দুই হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, যেখানে ঋণাত্মক ছিল এক হাজার ১৬৫ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) মোট নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে নতুন বিনিয়োগের তুলনায় উত্তোলন হয়েছে বেশি। এই অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হলো মেয়াদ পূর্তির পর অর্থ তুলে নেওয়া এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র ভাঙার প্রবণতা বৃদ্ধি। অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সঞ্চয় ভেঙে ব্যবহার করছে, যা সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা এবং মানুষের হাতে অতিরিক্ত আয় না বাড়লে এই প্রবণতা দ্রুত বদলাবে না। বরং আগামী সময়েও সঞ্চয়পত্র ভাঙার চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সঞ্চয়পত্রের আকর্ষণ কমে যাওয়ার পেছনে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগও একটি বড় কারণ। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী এখন সেখানে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি কর-সংক্রান্ত জটিলতা, অনলাইন যাচাই প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগের শর্ত কঠোর হওয়ায় অনেকেই সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আগে সরকার ঋণের বড় অংশ সঞ্চয়পত্র থেকে নিলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিকল্প মাধ্যম জনপ্রিয় হচ্ছে। দ্রুত নগদায়নের সুবিধাও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, টানা কয়েক অর্থবছর ধরেই সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক। ফলে সরকার নতুন ঋণ পাওয়ার বদলে পুরনো দায় পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ৯ মাস শেষ হওয়ার আগেই তা ছাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে। এতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে মার্চ পর্যন্ত নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে দুই হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ঋণাত্মক এক হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং জানুয়ারিতে এক হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ডিসেম্বর মাসে কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচকই রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রথম ৯ মাসে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছে দুই হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরেও একই চিত্র ছিল। তখনও সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ পায়নি। বরং পুরো অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়েছিল ছয় হাজার ৬৩ কোটি টাকা।
তার আগের অর্থবছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে নিট বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল প্রায় ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। আর ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা ছিল তিন হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ টানা চার অর্থবছর ধরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে নতুন ঋণ পাওয়ার বদলে পুরনো দায় পরিশোধেই বেশি ব্যয় করছে।
এ পরিস্থিতি এখন সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না আসায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের নির্ধারিত সীমা আগেই অতিক্রম করেছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এদিকে ব্যাংক থেকে সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে।

