দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম হয়ে উঠেছে বিনিয়োগে স্থবিরতা। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা বড় প্রকল্পে অর্থ লগ্নির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্পষ্ট অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এক সময় যেসব ব্যবসায়ী নতুন কারখানা, উৎপাদন বৃদ্ধি বা রপ্তানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করতেন, তাদের বড় অংশ এখন অপেক্ষার অবস্থানে। অনেক শিল্পগোষ্ঠী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিনিয়োগ ভীতি শুধু ব্যবসায়ীদের মানসিক সংকট নয়। এটি অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতার প্রতিফলন। কারণ বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
উচ্চ সুদহার এখন বড় বাধা:
ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই হারে ঋণ নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপন করলে লাভের চেয়ে ঝুঁকি বেশি।
একই সঙ্গে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ বেড়েছে এবং পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে বিক্রিও প্রত্যাশিতভাবে বাড়ছে না। ফলে নতুন বিনিয়োগ থেকে লাভ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একজন শিল্প উদ্যোক্তার ভাষায়, ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ এখন অনেকটাই ঝুঁকির পথে হাঁটার মতো। কারণ ব্যবসায় লাভের নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু সুদ পরিশোধ বাধ্যতামূলক। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ সুদহার স্বাভাবিক বিনিয়োগ প্রবাহ থামিয়ে দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের বদলে ঝুঁকি এড়িয়ে চলার পথ বেছে নিচ্ছেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ঝুঁকি:
শিল্প উদ্যোক্তাদের আরেকটি বড় অভিযোগ গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও সংযোগ মিললেও পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না।
রপ্তানিমুখী শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সক্ষমতা বাড়ছে না। একজন তৈরি পোশাক শিল্প মালিক বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা ছাড়া নতুন কারখানায় কেউ বিনিয়োগ করবে না।
ডলার সংকট ও আমদানি চাপ:
ডলার বাজারের অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। উদ্যোক্তারা বলছেন, এলসি খোলা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো আমদানিতে বেশি সতর্কতা নিচ্ছে।
যেসব শিল্প আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। ডলারের উচ্চ দামের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, স্থিতিশীল মুদ্রা পরিবেশ ছাড়া কেউ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না। বর্তমানে সেই স্থিতিশীলতা অনুপস্থিত।
করনীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা:
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কর ও শুল্ক কাঠামোতে ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করছে। বাজেটের বাইরে হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নতুন কর আরোপ কিংবা শুল্ক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তাদের মতে, শিল্পনীতি, রাজস্বনীতি ও বাণিজ্যনীতির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, শিল্পে বিনিয়োগ মানে দীর্ঘ ১০ থেকে ১৫ বছরের পরিকল্পনা। নীতিগত স্থিতিশীলতা না থাকলে সেই ঝুঁকি কেউ নেবে না।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এতে দেশীয় বাজারে পণ্যের চাহিদা কমেছে। খুচরা বাজার, নির্মাণ খাত, ভোগ্যপণ্য শিল্প এবং মাঝারি শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে, কোথাও কর্মী ছাঁটাইও শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, চাহিদা না বাড়লে নতুন বিনিয়োগও আসে না। কারণ উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ বাজারে আস্থা না থাকলে বিনিয়োগ করেন না।
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন নতুন ঋণ দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ খাতে অর্থায়ন করছে। ফলে শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে এবং বিনিয়োগের গতি আরও কমেছে।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো সুবিধা এবং মুনাফা স্থানান্তরের নিশ্চয়তা খোঁজেন কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে তারাও এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ কমে গেলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানও কমে যাবে। নতুন শিল্প না এলে তরুণদের চাকরির সুযোগ সীমিত হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও রপ্তানি কমে গেলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হবে। তাদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আস্থা পুনরুদ্ধার। এজন্য প্রয়োজন সুদহার সহনীয় করা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা, করনীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতা আনা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রণোদনা দিলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে অর্থনীতির স্থবিরতা আরও গভীর হতে পারে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তা অপেক্ষায় আছেন—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কত দ্রুত কাটে এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা কতটা ফিরে আসে। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিনিয়োগ প্রবাহ।

