প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের নজর এখন উত্তরাঞ্চলের আরেকটি বড় উদ্যোগ—তিস্তা মহাপরিকল্পনার দিকে।
উত্তরের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে তিস্তা নদীকে ঘিরে। কৃষি, মাছ ধরা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন হাজারো পরিবার। অনেকেই এখনো বাস্তুহারা হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যেই পদ্মা ব্যারাজের মতো বৃহৎ কাঠামোর আদলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিস্তা তীরের মানুষের সম্পদ, জীবন ও জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তিস্তা ব্যারাজ নিয়ে ২০২৩ সালে একটি সমীক্ষা শেষ হয়েছে। আরেকটি সমীক্ষা বর্তমানে চলমান। চীনের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সমীক্ষা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা, কাঠামো ও কার্যক্রম চূড়ান্ত করা হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে তার একান্ত সচিব মো. মারুফ দস্তগীর বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ চলমান। এর মধ্যে কী কী বিষয় থাকবে তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।”
গত ১৮ মে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদন নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘কৌশলগত রূপরেখা’ও অনুমোদন করা হয়। ওই রূপরেখায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা থাকতেই হবে।”
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী জানান, “আগে তিস্তা প্রকল্পে চীনের কাছে ঋণ চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। তবে নতুন সরকারের সময়ে আর কোনো নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। সব ঠিক হলে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হবে।”
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসেন খান বলেন, “কিছুদিন আগে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেয়েছে। একই ধাঁচে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। মাটি, পানি, মাছ ও কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার ইতিহাস অনেক পুরোনো। ১৯৯০ সাল থেকে নদীকে ঘিরে পরিকল্পনা শুরু হলেও ২০১০ সালের পর এটি স্পষ্ট রূপ পায়। ২০১৬ সালে চীনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না আগ্রহ দেখালে প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। ২০২০ সালে চীনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আলোচনা অনেক দূর এগোয়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থায়ন কাঠামো ও অংশীদারত্ব নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হয়।
পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে নদী খনন ও ড্রেজিং, নদীভাঙন রোধে উভয় তীরে শক্ত প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ, সেচ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বর্ষার পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার তৈরি, শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল গঠন, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সড়ক ও সেতু নির্মাণ।
সূত্র অনুযায়ী, তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। শুরুতে প্রায় ৫৫ কোটি মার্কিন ডলারের সহজ ঋণের সম্ভাবনা থাকলেও নতুন পরিস্থিতিতে সেই কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব বলেন, “সবকিছু চূড়ান্ত হলে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হবে।”
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, “এ নিয়ে একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাই। বাস্তবায়ন হলে সেটি আপনারা দেখতে পাবেন। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও রয়েছে।”
তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের রংপুর ও কুড়িগ্রাম দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনায় মিশেছে। বাংলাদেশ অংশে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। এর অববাহিকায় প্রায় দুই কোটি মানুষ বসবাস করে। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি প্রায় শুকিয়ে যায়, আর বর্ষায় ভয়াবহ রূপ নেয়। ১৯৮৩ সালে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করে। পরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
১৯৭৩-৮০ সালে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৫ হাজার কিউসেক। ২০০০ সালের দিকে তা ৫০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসে। বর্তমানে অনেক সময় এটি ২০০-৩০০ কিউসেকেও নেমে যায়। অন্যদিকে তিস্তা সেচ প্রকল্পে প্রয়োজন থাকে ৮ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি। এই ঘাটতির কারণে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার কৃষি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক এলাকা মরুভূমির মতো হয়ে পড়ছে, যেখানে তামাক চাষই প্রধান বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি বছর নদীভাঙন ও বন্যায় বিপুল ক্ষতি হয় এই অঞ্চলে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ও জমি হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা অববাহিকায় ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। বর্ষাকালে উজান থেকে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে পাঁচটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নদীভাঙন ও ফসলি জমি ধ্বংস হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় মানুষরা। নানা বাধা ও জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার থমকে গেলেও এবার সরকার এটিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে।

