দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ শক্তিশালী না হলে বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে আসবে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সমাজ গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন- একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ। এতে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, আনু মুহাম্মদ, মোস্তাফিজুর রহমান এবং সেলিম রায়হান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নজরুল ইসলাম।
আলোচনায় তিতুমীর বলেন, সরকার ইতোমধ্যে এসআরও জারি করে রাজস্ব নীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। অতীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে এসআরওভিত্তিক নীতির মাধ্যমে এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। এখন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, আঞ্চলিক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুধু আমদানিনির্ভরতা বাড়ালে চলবে না, বরং দেশে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং এলএনজি অবকাঠামো সংস্কারও জরুরি বলে মত দেন তিনি।
খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বাফার মজুত তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। শস্য, দুধজাত পণ্য, ফল ও ফুল উৎপাদনে উদ্বৃত্ত অঞ্চলগুলোকে ভ্যালু সংযোজনের মাধ্যমে শিল্পায়নের আওতায় আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক জরিপে শিল্পায়নের ধীরগতি, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সংকোচনের বিষয় উঠে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত আঞ্চলিক পরিকল্পনার পথে এগোচ্ছে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের সুদের হার বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ সুদের হারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যায়। এ কারণে নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই বিনিয়োগবান্ধব একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করবে, যা ব্যবসা ও শিল্প খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হাওর, বাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি বলেন, বন্যা, পলি জমা, স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় মাছের সংকট মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব করার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
পরিবহন খাত নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রেল খাত অবহেলার শিকার হয়েছে। দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার বদলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।

