চামড়া খাতে ব্যাংক ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় পুরো খাতটি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা হলেও এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ এখন অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু খেলাপি ঋণই নয়, আরও প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ঋণ আদায় করা সম্ভব না হওয়ায় তা অবলোপন বা রাইট অফ করা হয়েছে। এসব ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আর্থিক চাপ আরও গভীর হচ্ছে।
চামড়া শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নেওয়া ঋণ সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় সমস্যাটি ক্রমে জটিল আকার ধারণ করেছে।
এদিকে খেলাপি ঋণের কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না। চলতি বছরে এ খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে ঈদের আগের শেষ ব্যাংকিং দিনের তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ হয়েছে খুবই সীমিত পরিমাণ অর্থ। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চামড়া সংগ্রহ মৌসুমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু নীতিগত শিথিলতা দিয়েছে। নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের জন্য কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে আংশিক পরিশোধ করলেও তারা নতুন ঋণের সুবিধা নিতে পারবেন। তবে পুরো অর্থ পরিশোধ না হলেও এই সময়ের মধ্যে খেলাপি ঘোষণা করা হবে না।
অন্যদিকে, যারা আগে থেকেই খেলাপি অবস্থায় আছেন তাদের জন্য বিশেষ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ রাখা হয়েছে। মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়ন করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক উদ্যোক্তা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি বলে জানা গেছে। ফলে নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়ে গেছে।
চলতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের পরিকল্পনা করলেও খেলাপি পরিস্থিতির কারণে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জনতা, অগ্রণী, রূপালীসহ কয়েকটি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ঝুঁকির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হলেও অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি।
গত বছরের চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। তখন চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, কিন্তু বাস্তবে বিতরণ হয় মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এর বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়া খাতের এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বাজারে অনিশ্চয়তা এবং ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহ। একই সঙ্গে কাঁচা চামড়ার দামের ওঠানামাও উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করছেন, কার্যকর নজরদারি ও কঠোর ঋণ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা বলছেন, মৌসুমভিত্তিক ব্যবসার কারণে নগদ প্রবাহে সমস্যা হয়, তাই ঋণ কাঠামো আরও নমনীয় করা দরকার।
সব মিলিয়ে চামড়া খাত এখন একদিকে যেমন বিপুল সম্ভাবনার শিল্প, অন্যদিকে তেমনি বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখেও দাঁড়িয়ে আছে।

