টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়ন সংকট। আগামী পাঁচ বছরে এসডিজির লক্ষ্য পূরণে দেশের অতিরিক্ত প্রায় ৪২১ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।
রাজধানীতে আয়োজিত এসডিজি অর্থায়নবিষয়ক জাতীয় ভ্যালিডেশন কর্মশালায় রোববার (২৬ জুলাই) তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আয়োজিত এ কর্মশালায় সহযোগিতা করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয়।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৪২১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। এই অর্থের জোগান দিতে সরকারি-বেসরকারি দেশীয় উৎস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর করে এসডিজির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন অর্থায়নের পথ তৈরি করতে হবে।
অর্থায়ন ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ:
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের হাতে থাকা সময় সীমিত। একই সঙ্গে অর্থায়নের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে এসডিজি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং শক্তিশালী বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরজনিয়াক বলেন, বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তিনি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতকে টেকসই উন্নয়নমুখী বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এলডিসি উত্তরণের সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ:
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়ে একটি বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করতে হবে।
ইউএনডিপির উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়ারত্নে বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে কার্যকর নীতি গ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা প্রয়োজন। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কর্মশালায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে পরিচালিত ইউএনডিপির ক্লাইমেট ফাইন্যান্স নেটওয়ার্ক কর্মসূচির সহায়তায় এ আয়োজন করা হয়।
বক্তারা বলেন, এসডিজির লক্ষ্য পূরণে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরীক্ষা। এজন্য কর আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় সম্পদ আহরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।

