জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে একটি বিশেষ বলয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সময়ে এই পরিস্থিতির শুরু হয়। তাদের ভাষ্য, তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী এনবিআরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। রাজস্ব আদায়ের চেয়ে বদলি ও পদোন্নতির মতো প্রশাসনিক বিষয়গুলোতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনবিআর সূত্র জানায়, আবদুর রহমান খান এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি ছিলেন আয়কর ক্যাডারের কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আয়কর বিভাগ ও শুল্ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি ঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করেন। ওই বলয়ের সদস্যদের প্রভাবেই বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তাদের আরও অভিযোগ, এনবিআর পৃথকীকরণের দাবিতে আন্দোলনের সময় শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তত ৩৯ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ছাড়া রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তে অডিট ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব রাজস্ব আদায়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা:
এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক অর্থবছর ধরেই সংস্থাটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। ওই বছর আদায় হয় ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ছিল প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয় ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আবদুর রহমান খানের দায়িত্বকালের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয় ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ওই বছর এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এনবিআরের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফল হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থাটিকে বড় রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সময়ে রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া অডিট ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, হয়রানির অভিযোগ তুলে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের এসব কার্যক্রম সীমিত করেন। এর ফলে রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও কাজের আগ্রহ কমে যায়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে হয়রানির অভিযোগ দেখিয়ে পুরো প্রক্রিয়াই স্থবির করা হয়। পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করায় মাঠপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
অবশ্য অবসরের আগে শেষ সময়ে এসে অডিট ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম আবার চালু করা হয়। এ বিষয়ে জানতে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এনবিআরের সূত্রগুলো বলছে, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আবদুর রহমান খান ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বসান। এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময় একজন কর্মকর্তা তার অনুরোধ উপেক্ষা করে ভ্যাট ফাঁকির মামলা করায় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।
এ ছাড়া পছন্দের ব্যবসায়ীর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে আসা পণ্য চালান আটক ও ফৌজদারি মামলা করার ঘটনায় কয়েকজন শুল্ক কর্মকর্তার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন চেয়ারম্যান—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ওই ঘটনার পর একজন জ্যেষ্ঠ কমিশনারকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হয়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে অ্যাসেসমেন্ট কমিটির কার্যক্রম চলাকালে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ফোন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একই সঙ্গে তার বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এক কর্মকর্তাকে প্রথমে বদলি এবং পরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, একই সময়ে পৃথকীকরণের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা কিছু কর্মকর্তাই পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন এনবিআরের অনেকে।
অবসরের আগে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্স পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান লাইসেন্সিং বিধিমালায় পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করায় এখনো ফল প্রকাশ হয়নি। এ ঘটনায় এনবিআরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়মের বাইরে গিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চলতি অর্থবছরের বাজেটে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে পারে। এর মধ্যে ভ্যাটের সুদ মওকুফ এবং তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান অন্যতম। এনবিআরের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, এসব সিদ্ধান্তের কারণে সরকারের নিয়মিত নগদ অর্থ প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।
এনবিআরের একাধিক সূত্রের দাবি, আবদুর রহমান খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আয়কর বিভাগের বিভিন্ন কর অঞ্চল, গোয়েন্দা সংস্থা, কাস্টমস হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেটেও তাদের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার মধ্যে মোয়াজ্জেম হোসেন ও বেলাল আহমেদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মো. আরিফুল ইসলাম এখনো শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে রয়েছেন।
শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগের পর কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরানো হলেও তার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একইভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও সাবেক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের কারণে মাঠপর্যায়ের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক রাজস্ব সংগ্রহে।
