আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিকে আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোর লক্ষ্য সামনে রেখে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন বাজেটের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ২০৪১ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং কল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা।
একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বাড়ানো, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনায় আরও রয়েছে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, আর্থিক খাত পুনর্গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। পাশাপাশি চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতিনির্ভর সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও সহায়তার কথা ভাবা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই বড় আকারের বাজেটের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে পারে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে সময় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল।
বাজেটের বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। তবে সাধারণভাবে দেশে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে আদায় ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে।
সরকারের মোট রাজস্বের বড় অংশ আদায়কারী সংস্থা এনবিআরের জন্য আগামী বাজেটে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
বর্তমান লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাকি সময় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে এনবিআরকে। এজন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, যা সংশ্লিষ্টদের মতে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, সরকারের ব্যয় মেটাতে এবং ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব বাড়ানো জরুরি। তবে শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন। তাঁর মতে, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এত বড় রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
রাজস্ব বাড়াতে সরকার কর ব্যবস্থার অটোমেশন, করের আওতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়ন এবং করবহির্ভূত আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও বাড়ানো হচ্ছে।
নতুন বাজেটে মোট ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের সামষ্টিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি। আগামী অর্থবছরে এই দুই কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৩ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হতে পারে ১৩ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা।

