রাজধানী ও গাজীপুরের মধ্যে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ এই বাসসেবা চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যানজট ছাড়াই চলাচলের সুবিধা পাবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এখন দেখা যাচ্ছে, ঘোষিত সেই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং এ প্রকল্প চালু হলে যানজট ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে নেতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছে। অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে চার সদস্যের ওই দল গত মাসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দেয়।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরটি প্রকল্প দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি ‘ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার’ প্রতীক। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল, কার্যকর সমন্বয় এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
প্রতিবেদনে পরিকল্পনার ত্রুটি, নকশাগত দুর্বলতা, বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সমন্বয়হীনতা এবং দায়বদ্ধতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিআরটি কার্যক্রম বন্ধ করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশও করা হয়েছে।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, প্রকল্প বাতিলের পক্ষে যেমন জোরালো মত রয়েছে, তেমনি কিছু অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে আংশিক সুবিধা আদায়ের পক্ষেও মতামত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এরপর প্রকল্প বন্ধ করা হবে নাকি নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথে বিআরটি প্রকল্পের আওতায় ১৫টি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিছু স্টেশন মাটিতে, আবার কিছু উড়ালপথে নির্মিত হয়েছে। যাত্রীদের জন্য আধুনিক পথচারী পারাপার ব্যবস্থা, চলন্ত সিঁড়ি এবং কিছু স্থানে লিফট স্থাপন করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো এখন অচল অবস্থায় রয়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে, কোথাও আবার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী কাভার্ড ভ্যানচালক মো. সোহেলের ভাষ্য, বিআরটি প্রকল্পের কারণে অতীতে ভয়াবহ যানজটের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি জানান, ২০২২ সালের এক বর্ষার দিনে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গাজীপুর পার হতে তার প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। বর্তমানে বিআরটি লেনে অন্যান্য যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেওয়া হলেও সড়কে এখনো জট লেগে থাকে। বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত সাইন-সংকেত না থাকা, কোথাও উড়ালপথ আবার কোথাও সমতল রাস্তা, পাশাপাশি সড়ক সরু হয়ে যাওয়ার কারণে চালকদের ভোগান্তি বাড়ছে।
১৪ বছরের প্রকল্প, ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি:
২০১২ সালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে বাস চলাচল শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
সময়ের সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ একাধিকবার সংশোধন করা হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পরে চতুর্থ সংশোধনীতে ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন না দিয়ে প্রকল্পের বিকল্প ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেয় সরকার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকা অবস্থায় প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করা যৌক্তিক হবে না। তাদের মতে, প্রকল্প বন্ধ করে অবকাঠামো অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, প্রকল্প চালু করতে গেলে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস কিনতে হবে। তবুও সফলতার নিশ্চয়তা নেই। ফলে প্রকল্পটি এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য এক ধরনের জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশা সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজ শুরু হওয়ার পর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর এবং নির্মাণকাজ চলাকালে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ে। বুয়েটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে স্টেশন নির্মাণের কারণে সড়ক সরু হয়ে গেছে। পদচারী সেতুর সংযোগ অংশ ফুটপাত দখল করেছে। আবদুল্লাহপুর, ভোগরা ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন নকশা করা হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতে নতুন পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।
বুয়েটের প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা না হলেও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা, অর্থায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন এবং বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি কমিউটার ট্রেনভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া অসমাপ্ত পদচারী সেতু দ্রুত শেষ করা এবং অচল লিফট ও চলন্ত সিঁড়িগুলো অন্য সরকারি স্থাপনায় স্থানান্তর বা নিলামে বিক্রির পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্প শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ছিল না। সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশায় গুরুতর ত্রুটি ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ এক যুগ ধরে জনগণ ভোগান্তি সহ্য করেছে, বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, অথচ যে সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল এড়ানোর জন্য এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

