দেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ধীরগতির মুখোমুখি। একসময় সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও এখন সেই গতি অনেকটাই কমে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতের মন্থরতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি দেশের উৎপাদন ও সেবাখাতের সম্প্রসারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্রবৃদ্ধি বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছর ধরে দেশের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে পৌঁছে, যা করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতির গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়ে। ফলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে। এতে অর্থনীতিকে সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের মতে, আগামী দুই বছরও বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধির চক্র থেকে সহজে বের হতে পারবে না। ফলে অর্থনীতির গতি যখন ক্রমাগত কমছে, তখন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এক ধাক্কায় বাড়ানোর পরিকল্পনাকে অনেক বিশ্লেষক বাস্তবতার চেয়ে বেশি আশাবাদনির্ভর বলেই মনে করছেন।
আগামী ১১ জুন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোর উদ্যোগ থাকবে। তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিবেশে কীভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখে প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা না বাড়িয়ে বড় ব্যয় পরিকল্পনা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরে রাখলে ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে একদিকে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে।
সরকার আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু উচ্চ সুদহার, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি খরচ এবং বাজারের অস্থিরতা সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।
অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের প্রয়োজন হলেও উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখনো আস্থার ঘাটতি রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ, ডলার সংকট, ব্যাংকঋণ প্রাপ্তি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সেই আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমানের মতে, সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব বা মুদ্রানীতি গ্রহণের সুযোগ বর্তমানে সীমিত। কারণ মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি মনে করেন, কেবল চাহিদা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি নয়, বরং উৎপাদনশীলতাভিত্তিক সংস্কারই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

