ঈদুল আজহা ঘিরে দেশের চামড়া বাজারে আবারও দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিনের সংকটের প্রতিফলন। কাঁচা চামড়ার দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী ও সংগ্রহকারীদের বড় অংশ এবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই লাভের আশায় চামড়া কিনলেও শেষ পর্যন্ত বিক্রির সুযোগ না পেয়ে বিপাকে পড়েন।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, ক্রেতার অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া অবিক্রিত থেকে যায়। ফলে কিছু ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দেন, আবার কেউ কেউ মাটিচাপা দিয়ে তা নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে চলা অব্যবস্থাপনারই আরেকটি প্রকাশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় এক দশক ধরে দেশের চামড়া শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত। প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ফলে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) গড়ে তুলতে না পারা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে আছে দেশের চামড়া শিল্প।
এর প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের। আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনাময় এই খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অবকাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতেও ঈদকেন্দ্রিক চামড়া সংগ্রহ ও বিপণনে একই ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে, যার ক্ষতি বহন করতে হবে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পুরো শিল্পখাতকেই।
সম্ভাবনার পাহাড়, কিন্তু রপ্তানিতে স্থবিরতা:
সরকারি দাম কাগজে, বাজারে মিলল না তার ছায়াও:
সাভারে স্থানান্তরের পরই কি গভীর হয়েছে চামড়া খাতের সংকট?
ঈদুল আজহার পর সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া সংগ্রহ ও বিপণন কার্যক্রমে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার চিত্র উঠে এসেছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চামড়া পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা পুরো খাতের দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে।
নিয়ম অনুযায়ী ঈদের পর প্রথম সাত দিন ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানীমুখী চামড়া পরিবহনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার কথা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে জানা গেছে, বাস্তবে বিপুল পরিমাণ চামড়া ঈদের পরপরই সাভার শিল্পনগরীতে পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর থেকে পরদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত সময়ে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৯টি কোরবানির পশুর চামড়া প্রবেশ করে। আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২টি।
চামড়া প্রবেশের সামগ্রিক হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। গত বছর ঈদের প্রথম তিন দিনে শিল্পনগরীতে মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭টি চামড়া এসেছিল। অথচ চলতি বছর ৩০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রবেশ করা চামড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫টি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, এত অল্প সময়ে চামড়ার এই অস্বাভাবিক প্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে ঢাকার বাইরের বহু এলাকার চামড়া যথাযথ সংরক্ষণ ছাড়াই সরাসরি শিল্পনগরীতে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁদের ধারণা, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লবণ ব্যবহার না করেই দ্রুত বাজারে সরবরাহের চেষ্টা করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের অভিযোগও সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। তাঁদের ভাষ্য, দূরদূরান্ত থেকে ট্রাকে করে চামড়া নিয়ে আসার পর আড়তদারদের প্রস্তাবিত কম দাম মেনে নেওয়া ছাড়া অনেকের আর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ একবার শিল্পনগরীতে পৌঁছানোর পর চামড়া ফেরত নেওয়ার মতো অতিরিক্ত পরিবহন ব্যবস্থা বা শ্রমিক সহায়তা তাঁদের হাতে ছিল না। ফলে দরকষাকষির সুযোগ না পেয়েই অনেক ব্যবসায়ী লোকসান গুনে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
তবে ডিপো মালিকেরা এই পরিস্থিতির জন্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বাজারে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের অভাব, প্রয়োজনীয় সরকারি অর্থায়ন না পাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বকেয়া অর্থ সময়মতো পরিশোধ না হওয়াই বর্তমান অস্থিরতার প্রধান কারণ। তাঁদের দাবি, আর্থিক প্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় বাজারে প্রত্যাশিত লেনদেন সম্ভব হয়নি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চামড়ার দামের ওপর।

