বাংলাদেশে জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় এলেই একটি পরিচিত আলোচনা সামনে আসে—বাজেট নাকি অনেক বড়। রাজনৈতিক বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম, ব্যবসায়ী মহলের প্রতিক্রিয়া কিংবা সাধারণ মানুষের আড্ডা—সব জায়গাতেই প্রায় একই ধরনের কথা শোনা যায়। কেউ বলেন এটি বড় বাজেট, কেউ বলেন ঋণনির্ভর বাজেট, আবার কেউ একে শুধু সংখ্যার খেলা বলে উড়িয়ে দেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজেটের অঙ্ক বড় দেখালেই কি সেটি সত্যিকার অর্থে বড় হয়ে যায়? নাকি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার, জনসংখ্যা, উন্নয়ন চাহিদা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার প্রয়োজন বিবেচনায় এই বাজেট বরং ছোট? সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশের বাজেট সংখ্যায় বড় মনে হলেও মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়েই কম।
এখানেই বাজেট বিতর্কের মূল জায়গা। শুধু মোট টাকার অঙ্ক দেখে বাজেটের শক্তি বোঝা যায় না। একটি দেশের অর্থনীতি কত বড়, সেই অর্থনীতির তুলনায় সরকার কত ব্যয় করতে পারছে, জনগণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রশাসনিক সেবা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে—এসব বিষয় বিবেচনায় না আনলে বাজেটের প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ১২.০৩ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের সরকারি ব্যয় ছিল ২৮.৩৮ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৯.৪৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ১৯.৩২ শতাংশ। ভুটানে এই হার ছিল ২৭.১৩ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ১৭.২৬ শতাংশ, হংকংয়ে ২৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৬.৮৪ শতাংশ। প্রতিবেশী মিয়ানমারেও ২০২৪ সালে সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ২৩.৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকা অন্যান্য দেশের সঙ্গেও তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান খুব উজ্জ্বল নয়। ২০২৪ সালে সেনেগালে সরকারি ব্যয়ের হার ছিল ৩৩.৫৫ শতাংশ এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জে ছিল ৩৫.৮১ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাজেটকে শুধু টাকার অঙ্কে বড় বলা হলেও অর্থনীতির তুলনায় সরকারের ব্যয়ের সামর্থ্য এখনও সীমিত।
এই বাস্তবতা বোঝাতে বলা যায়, দ্রুত বড় হতে থাকা একটি শহরের জন্য যদি পানির ট্যাংক ছোট থাকে, তবে সেই শহরের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বাজেটের অবস্থাও অনেকটা তেমন। অর্থনীতি বড় হচ্ছে, মানুষের চাহিদা বাড়ছে, অবকাঠামোর প্রয়োজন বাড়ছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগের দাবি বাড়ছে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
এর প্রধান কারণ দুর্বল রাজস্ব আহরণ। বাংলাদেশের কর আদায়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই খুব কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করে। কিন্তু সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, পরে সেটি ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কমানো হয়। এরপরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ফলে কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৬.৮ শতাংশে, যা একই ধরনের উন্নয়নপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় খুবই কম।
এখানে সমস্যা শুধু অর্থের ঘাটতি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ঘাটতিও বড় বিষয়। রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতা, সীমিত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর ফাঁকি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি রাজস্ব সংগ্রহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে না, আর অর্থ না থাকলে জনসেবা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাংলাদেশের কম সরকারি ব্যয়ের পেছনে মূল কারণ রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা। তাঁর পর্যবেক্ষণে, এটি শুধু ব্যয় সংযমের বিষয় নয়; বরং রাজস্ব আহরণে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তবে রাজস্ব কম হওয়াই একমাত্র সমস্যা নয়। যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, সেটিও সবসময় সময়মতো ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায় না। প্রকল্পে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জট, সমন্বয়ের অভাব এবং বাস্তবায়ন দুর্বলতার কারণে সরকারি ব্যয়ের কাঙ্ক্ষিত সুফল অনেক সময় জনগণের কাছে পৌঁছায় না। এতে উন্নয়ন ব্যয়ের মান ও প্রভাব দুটিই কমে যায়।
বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। বাংলাদেশের সামনে বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অনেক বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প সময়মতো এগোয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে শুধু উন্নয়ন কাজ পিছিয়ে যায় না, বরং বিদেশি অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সরকারি ব্যয় কেন গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি, নগরসেবা—এসব ক্ষেত্রেই সরকারি ব্যয়ের প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বেশি সরকারি ব্যয় সাধারণ মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সহায়তা হতে পারে। কারণ এসব খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ব্যয়চাপ কমে।
অবকাঠামো ব্যয়ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো রাস্তা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কার্যকর বন্দর, উন্নত পরিবহন ও শিল্প অবকাঠামো ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হয় না। ফাহমিদা খাতুনও বলেছেন, ভৌত অবকাঠামোর উন্নতি না হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়বে না, আর বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার সম্ভাব্য জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন হলেও শুধু ব্যয় বাড়ালেই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। ব্যয়ের গুণগত মান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সমান জরুরি। ভুল প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয়, দুর্বল পরিকল্পনা বা বিলম্বিত বাস্তবায়ন হলে বড় বরাদ্দও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বলতা সাম্প্রতিক তথ্যেও স্পষ্ট। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৪১.৪১ শতাংশ বরাদ্দ ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ অর্থবছরের বড় অংশ পার হয়ে গেলেও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্ধেকেরও কম বাস্তবায়িত হয়েছে। এটি দেখায়, বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, বাস্তবায়ন দুর্বল হলে সেই বাজেটের প্রভাব সীমিত থাকে।
তাই বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আলোচনায় শুধু “বড়” বা “ছোট” শব্দে আটকে থাকলে আসল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। প্রকৃত সংকট হলো—রাষ্ট্র যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে না, আবার সংগৃহীত অর্থও সবসময় দক্ষভাবে ব্যয় করতে পারছে না। এর ফলে জনসেবা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী বাজেট দরকার। কিন্তু সেই শক্তি শুধু বড় অঙ্কে নয়; রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা, ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এবং জনকল্যাণমুখী অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করে।
সুতরাং, প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—বাংলাদেশের বাজেট কত বড়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশের বাজেট কি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট কার্যকর? বর্তমান বাস্তবতা বলছে, বাজেটের আকার নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হওয়া দরকার রাজস্ব আহরণ, ব্যয়ের মান এবং উন্নয়ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে। কারণ বড় অঙ্কের বাজেট নয়, কার্যকর বাজেটই মানুষের জীবন বদলাতে পারে।
সিভি/এইচএম

