২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে বেশ কয়েকটি নতুন উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে ছিল সম্পদ কর আরোপ, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর চালু এবং নির্দিষ্ট শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ। তবে শেষ মুহূর্তে এসব প্রস্তাব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্পদ কর চালুর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আপাতত এই কর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না আসায় প্রস্তাবটি স্থগিত রাখা হয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘ সময় ধরে সম্পদ কর নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি কাঠামোও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত না পাওয়ায় বিষয়টি আপাতত এগোচ্ছে না।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, করদাতার আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত নিট সম্পদের ভিত্তিতে এই কর নির্ধারণের কথা ছিল। কারণ সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণকে জটিল বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে সম্পদ মূল্যায়নের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তাও ছিল।
পরিকল্পনায় চার কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব ছিল। এরপর ধাপে ধাপে সম্পদের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে করের হারও বাড়ার কথা ছিল। সর্বোচ্চ স্তরে ১৬ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব বিবেচনায় ছিল।
১১০ সিসির বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর রাইড-শেয়ারিং চালক ও বাইকারদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এনবিআর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ১৬৫ সিসির বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেলের মালিকদের জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক করা হবে।
এদিকে দেশে দ্রুত বাড়তে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর ওপরও অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার জন্য বছরে পাঁচ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় দুই হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এক হাজার টাকা কর নির্ধারণের চিন্তা করা হয়েছিল। তবে এই উদ্যোগও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় ছিল। জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্থাপনা কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য আয়কর নথিতে উল্লেখ করে নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে এ সুযোগ দেওয়ার আলোচনা হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাবও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। ফলে চলতি অর্থবছরের মতো আগামী বাজেটেও কালো টাকা বৈধ করার কোনো বিশেষ সুবিধা থাকছে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, সম্পদ কর তাত্ত্বিকভাবে আয়বৈষম্য কমাতে এবং করের আওতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবে এটি প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর ভাষায়, সরাসরি সম্পদ কর আরোপ করলে রাজস্ব প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুঁজি বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশ এ ধরনের কর থেকে সরে এসেছে। তবে তিনি মনে করেন, সম্পদের তথ্য গোপন করার সুযোগ বন্ধ করা গেলে কর ফাঁকি অনেকটাই কমে আসবে। সম্পদের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা গেলে আয়ের উৎসও সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে।
মোটরসাইকেল ও বিদ্যুৎচালিত রিকশার মালিকদের করের আওতায় আনার বিষয়েও তিনি ইতিবাচক মত দেন। তাঁর মতে, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ছাড় রেখে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল ও বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের মালিকদের ন্যূনতম করের আওতায় আনা যেতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সম্পদ কর চালু না করার বর্তমান সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক হলেও ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের কর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ না থাকাই ভালো। তাঁর মতে, এ ধরনের সুবিধা থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয় না, বরং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি থাকে।

