আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি অস্থিরতার ধাক্কা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করতে মোট বিনিয়োগকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৮ শতাংশ থেকে ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট বিনিয়োগের মধ্যে সরকারি বিনিয়োগের অংশ ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ ২১ দশমিক ৪ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবিরতা দূর করা না গেলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অধরাই থেকে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য অবশ্যই ইতিবাচক। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর না হলে উচ্চাভিলাষী এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে দেশের মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির ৩০ শতাংশের নিচে বা কাছাকাছি অবস্থান করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের বাড়তি সুদ, বিদেশি বিনিয়োগে ধীরগতি এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অর্থনীতির সম্ভাবনার তুলনায় বিনিয়োগের গতি পিছিয়ে রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এটি নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে বিনিয়োগের হার কার্যত স্থির রয়েছে। ২০২০ সালে বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২০২১ সালে তা দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ০২ শতাংশে। ২০২২ সালে ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশে উঠলেও ২০২৩ সালে কমে ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৪ সালে বিনিয়োগের হার ছিল ৩০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এই অবস্থায় মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগকে ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে অনেক অর্থনীতিবিদ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, শুধু বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। উচ্চ সুদহার, ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট এবং খেলাপি ঋণের চাপ নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও ডলার বাজারের অস্থিরতা উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, আস্থার সংকট দূর না হলে বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আসবে না। বিশেষ করে উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন শিল্পপ্রকল্প গ্রহণে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি এবং নীতিগত অস্থিরতা শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে। তাঁর ভাষ্য, জ্বালানি সংকটের কারণে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে উৎপাদনমুখী খাতে কর সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে শুল্ক ফেরত প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

