মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। এই বিশাল বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষা খাত।
তবে গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দের হার কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার ছিল সাড়ে ১০ শতাংশের ওপরে। ফলে এবার প্রায় এক শতাংশের মতো হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে টাকার অঙ্কে কিছুটা বৃদ্ধি রাখা হতে পারে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া উচিত। বাস্তবে বাংলাদেশে এই হার ২ শতাংশেরও নিচে। তারা মনে করেন, প্রতি বছর অন্তত ১ শতাংশ করে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। বরং বরাদ্দ কমে গেলে তা শিক্ষার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক হবে।
বিশেষজ্ঞদের আরও মত, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই শুধু মান ধরে রাখতে হলেও শিক্ষা খাতে বাড়তি বিনিয়োগ অপরিহার্য। গুণগত মান উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা দুটোই জরুরি।
বরাদ্দের চিত্র: সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, আগামী বাজেটে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া ১০টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতের দুটি প্রধান বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে—
- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ ধরা হতে পারে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ হতে পারে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা
দুটি মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়াতে পারে ৯২ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে এই দুই খাতে বরাদ্দ ছিল ৮২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থাৎ টাকার অঙ্কে প্রায় ৯ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা বাড়লেও, বরাদ্দের হার কমছে শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ।
আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ধরা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দাঁড়াবে জিডিপির ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ৯৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। তখন শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ এখানেও অনুপাত কমছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। বর্তমানে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
তিনি বলেন, “বরাদ্দ ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও আগামী বছরে কমে গেলে পরিস্থিতি সন্তোষজনক হবে না। বরং তা শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, তাই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।” তিনি আরও বলেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না। অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “যেখানে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার, সেখানে কমে গেলে তা অবশ্যই অ্যালার্মিং। শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।” তিনি আরও বলেন, শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে, তা আগে নির্ধারণ করা দরকার। শিক্ষাকে শুধু চাকরি নয়, মানবিক ও দক্ষ নাগরিক তৈরির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনো একটি স্থিতিশীল ও সুস্পষ্ট শিক্ষাদর্শনের অভাব রয়েছে। কখনো কারিগরি শিক্ষা, কখনো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ—এভাবে ধারাবাহিকতার ঘাটতি দেখা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করা উচিত বলেও মত দেন তারা।
বাজেটের বড় কাঠামো: আগামী অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত ১০ খাতে মোট বরাদ্দ হতে পারে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হলো—
- স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ: ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা
- স্থানীয় সরকার বিভাগ: ৪৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা
- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়: ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা
- সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ: ৩৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ৩১ হাজার ১০ কোটি টাকা
- কৃষি মন্ত্রণালয়: ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা
- বিদ্যুৎ বিভাগ: ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: ১৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা
বাজেটের সামগ্রিক চিত্র: নতুন বাজেটে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- মোট বাজেট: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা
- পরিচালন ব্যয়: ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা
- বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি: ৩ লাখ কোটি টাকা
- ঘাটতি বাজেট: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা
এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য: আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে—
- বেসরকারি বিনিয়োগ: ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ
- সরকারি বিনিয়োগ: ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ
এছাড়া ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তার হার কমে যাওয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, শুধু বরাদ্দ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

