নির্বাচনের পর প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করার কথা রয়েছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এবার বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিপুল ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পর্যালোচনায় বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বড় আকারের ব্যয় পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করাই হবে সরকারের প্রধান পরীক্ষা।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় সাত হাজার কোটি টাকা কম ছিল। সেই হিসাবে নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেট প্রায় ১৯ শতাংশ বড় হতে যাচ্ছে। সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও এবার তার চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাই বাজেটের আকার বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে সরকারকে একই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ প্রবাহ বজায় রাখা, ঋণ গ্রহণ সক্ষমতা ধরে রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।
মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার চাপও বাজেট ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকি ব্যয় মেটাতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় নিশ্চিত করতে হবে। ফলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনাও ছিল। তবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন না পাওয়ায় আপাতত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এতে বড় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, দেশের বর্তমান রাজস্ব সংগ্রহ সক্ষমতা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নতুন বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী। তাঁর মতে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে সরকারের অর্থায়ন চাপ বাড়বে এবং পুরো বাজেট বাস্তবায়ন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাজেটের আকার বড় হওয়া নিজেই সাফল্যের বিষয় নয়। প্রকৃত গুরুত্ব হওয়া উচিত বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। পরিকল্পিত ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা না গেলে বড় বাজেট অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মাহবুব আহমেদের মতে, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এই মুদ্রানীতির সঙ্গে সরকারি আর্থিক নীতির কার্যকর সমন্বয় না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।
রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকারের নতুন লক্ষ্য কত:
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, বাস্তবে আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকাও ছাড়াতে নাও পারে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজস্ব আয়ে ধারাবাহিক বৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্য ও অর্জনের ব্যবধান বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদায় ছিল তিন লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
নতুন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হচ্ছে। সংস্থাটির জন্য ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা এখন পর্যন্ত তাদের সর্বোচ্চ অর্জনের তুলনায় প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অতীতের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের প্রকৃত আদায় ছিল তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটিকে চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হলেও প্রথম নয় মাসেই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড ঘাটতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগের অর্থবছরে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছিল।
অন্যদিকে, এনবিআরবহির্ভূত উৎস থেকেও রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে এই খাত থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। প্রথম নয় মাসে এই উৎস থেকে রাজস্ব এসেছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে আয় ছিল ৪৮ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, আর তার আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বনাম বাস্তব সক্ষমতা:
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে আগামী বাজেটে ব্যয়ের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, শুরুতে অর্থমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার জন্য, যাতে একসঙ্গে বড় আর্থিক চাপ তৈরি না হয়। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আগামী বাজেটেই অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পরিবার মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবে। এতে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। একই ধারায় ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার কৃষককে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই কর্মসূচি বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো আটটি নতুন সামাজিক কর্মসূচি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা এবং আগের অর্থবছরে ছিল এক লাখ ৩৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
শিক্ষা খাতেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ধরা হচ্ছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি। তবে বর্তমানে বরাদ্দ থাকা অর্থ বাস্তবায়নেও ধীরগতির সমস্যা রয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
শিক্ষা খাতের বড় একটি প্রকল্প পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি–৫)-এর জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রায় দ্বিগুণ। এই বিপুল ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতির পুনর্গঠন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। বাজেট প্রণয়নের নীতিগত কাঠামোতে পাঁচটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সহমর্মিতার বিকাশ।
প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে যাচ্ছে বাজেটকে ঘিরে—এই অর্থনীতি কি সত্যিই এত বড় ব্যয়ের ভার বহন করতে পারবে? রাজস্ব ঘাটতি কি আরও বাড়বে, নাকি নতুন উদ্যোগে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে? প্রতিশ্রুতি পূরণ আর বাস্তব সক্ষমতার এই দ্বন্দ্বের শেষ কোথায় গিয়ে থামবে?

