বাংলাদেশের উন্নয়ন গতিপথ ক্রমেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এর ফলে টেকসই ফলাফল অর্জনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বাড়ছে চাপ। বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে দেশটি নিয়মিতভাবে শীর্ষ তালিকায় থাকে। এর মধ্যে ২০২১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সপ্তম এবং ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি তালিকায় ১৩তম।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক থেকে দুই শতাংশের সমান। এই ক্ষতি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
গত কয়েক দশকে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বিভিন্ন নীতি, কৌশল ও বাজেটীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু কার্যক্রমে অঙ্গীকার দেখিয়েছে। রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বর্তমান জলবায়ু অর্থায়ন দেশের উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন ও সহনশীলতার চাহিদা পূরণে তা কতটা কার্যকর।
প্রমাণ বলছে, বিদ্যমান অর্থায়ন বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অধিকাংশ অর্থায়ন দেশীয় সরকারি উৎসের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি বাস্তবায়ন দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং খাতভিত্তিক অগ্রাধিকারের ঘাটতি কার্যকর ফলাফল অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন সরকার, যারা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু কার্যক্রমে শক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী পুনরুদ্ধার, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগের মতো পরিকল্পনা এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যয় ধীরে ধীরে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এটি ছিল ২৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৪২ হাজার ২০৬ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। তবে গত ছয় অর্থবছর ধরেই এই ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের এক শতাংশের নিচে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় মাত্রা প্রায় তিন শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-২০৫০) অনুযায়ী ২০৫০ সাল পর্যন্ত অভিযোজন খাতে মোট প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বছরে গড় প্রয়োজন ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। অথচ বর্তমান জলবায়ু অর্থপ্রবাহ মাত্র ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত। ফলে প্রয়োজন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত দেশীয় অর্থের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রবাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত। গড়ে বছরে জলবায়ু অর্থ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন মাত্র ০ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, যা মোট অর্থপ্রবাহের ২০ শতাংশেরও কম।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান প্রায় ০ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও দেশটি জলবায়ু ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।
এ ছাড়া বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রধান উৎস সবুজ জলবায়ু তহবিল থেকে মাত্র ৪৬৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পেরেছে। অথচ জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন ২৩ হাজার কোটি ডলার। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬৮ শতাংশে, যা গত ৪৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একইভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এই হার ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশের একটু বেশি। এটি প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং বাস্তবায়ন দক্ষতা, সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে অর্থ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। জলবায়ু খাতে বরাদ্দ বাড়লেও গবেষণার অংশ কমছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে এটি ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪৭ শতাংশে। দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন ও নীতিনির্ধারণে এটি একটি বড় ঘাটতি তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে প্রতীকী অঙ্গীকারের বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। জলবায়ু বিনিয়োগ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক অর্থায়নে প্রবেশ সহজ করা, বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো—এই সবই হতে পারে ভবিষ্যৎ সহনশীল বাংলাদেশের ভিত্তি।
নতুন প্রশাসনের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি একটি বড় সুযোগ। রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নভিত্তিক জলবায়ু কাঠামোয় রূপান্তর করার সময় এখনই।

