আগামী অর্থবছর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাজেট বক্তৃতার শেষ মুহূর্তে এ নিয়ে কিছু পরিবর্তনও আনা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উপস্থাপনের সময় নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার ঘোষণা দিতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও রাখবেন। প্রায় ১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এটি একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকেই আংশিকভাবে কার্যকর শুরু হতে পারে। এজন্য বাজেটে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রথম ধাপে অর্ধেক বেতন কার্যকর:
প্রাথমিক ধাপে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর কর্মীরা নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি অংশ ও ভাতা পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে যুক্ত করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে বাকি ৫০ শতাংশ বেতন কার্যকর হবে এবং তৃতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় এ ঘোষণা আসতে পারে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান:
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ বেতন কাঠামো চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর নতুন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে নতুন বেতন কাঠামোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২১ সদস্যের বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
কমিশনের প্রতিবেদনে বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ ছিল। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কমিশনের প্রস্তাবে ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে বিভিন্ন পর্যায়ে বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। পরে সচিব পর্যায়ের কমিটি কিছু অংশ কাটছাঁট করে ভাতা সীমিত করার মত দেয়।
পেনশন ও ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা:
নতুন কাঠামোতে পেনশনেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন হলে তা শতভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে হলে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি হলে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে।
বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতায়ও পরিবর্তন আসতে পারে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসে ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশও রয়েছে।
বড় বাজেট ও সৃজনশীল অর্থনীতির পরিকল্পনা:
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হতে পারে। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হতে যাচ্ছে। এ বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে বোঝানো হচ্ছে—সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, সফটওয়্যার, ভিডিও গেম, ডিজাইন, অ্যানিমেশন, অনলাইন কনটেন্ট ও হস্তশিল্পের মতো ক্ষেত্রগুলোকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর।
সরকার এই খাতে প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদনে এর অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। এর মধ্যে নতুন কর্মসূচি যুক্ত হচ্ছে এবং ভাতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। নতুন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি, যেখানে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেতে পারে। কৃষক কার্ডের আওতায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষক বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবেন। এছাড়া মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ ও খাদেমদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
নতুন বাজেটে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের জন্য বিশেষ ভাতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের ভাতা মুক্তিযোদ্ধাদের সমান করা হচ্ছে। মোট ১৬ হাজার ৫১৩ জনকে চার শ্রেণিতে ভাগ করে মাসিক ভাতা দেওয়া হবে। শহীদ পরিবার পাবে ২০ হাজার টাকা, গুরুতর আহতরাও একই পরিমাণ ভাতা পাবেন। অন্য শ্রেণির আহতরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পাবেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধারা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পান, যা অপরিবর্তিত থাকবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ধরা হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর বড় অংশ সরকারি ও বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে। সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং প্রশাসনিক ব্যয়ের ওপরও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট শুধু সংখ্যার বড় নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর জোর—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

