দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে আসা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশি ঋণের বাড়তি চাপ, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা এবং অর্থ পাচারের মতো সমস্যায় অর্থনীতির ভিত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এমন বাস্তবতায় অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ মেয়াদের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে অর্থনীতির জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে আগামী তিন বছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি কমানো, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি-আমদানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
নীতিপত্র অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি, সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের সম্প্রসারণ এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশের মাধ্যমে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধাপে ধাপে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। সেই অবস্থান থেকে পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যকে অনেকেই অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন। তারপরও সরকারের প্রক্ষেপণে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৭ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও আশাবাদী অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, কার্যকর মুদ্রানীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসবে।
যদিও বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামবে। পরবর্তী বছর তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩৬ দশমিক ৮২ শতাংশে উন্নীত হবে।
কিন্তু বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় এই লক্ষ্যও বেশ উচ্চাভিলাষী। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে এই হার ৩৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৬২ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধিকেও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৯ শতাংশ। সরকার আগামী তিন বছরে তা ১০ দশমিক ৭১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা প্রবাসী আয় বৃদ্ধির বিষয়েও ইতিবাচক পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ছিল ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এই প্রবাহ বেড়ে ৪৯ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নের হার ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ১২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের অবদান থাকবে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন বর্তমানে ১ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রপ্তানি ও আমদানির ক্ষেত্রেও উন্নতির প্রত্যাশা রয়েছে সরকারের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। আগামী চার বছরে তা বেড়ে ১২ দশমিক ১৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে।
চলতি হিসাবের ভারসাম্যে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বর্তমানে ৩১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বেড়ে ৯২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে সরকারের পূর্বাভাস।
সব মিলিয়ে মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় একটি আশাবাদী ভবিষ্যৎচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

