ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্প এখন বড় ধরনের ব্যয়বৃদ্ধির কারণে কঠোর যাচাইয়ের মুখে পড়েছে। এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫-এর উত্তর রুটের সংশোধিত প্রস্তাবে নির্মাণ ব্যয় আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দুই প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা সংশোধনের জন্য পৃথক প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সংশোধিত ব্যয়ের পরিমাণকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হওয়ায় প্রস্তাব দুটি সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান কবির আহমেদ জানিয়েছেন, দুই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়ই অনেক বেশি। তাই প্রস্তাবগুলো কঠোরভাবে যাচাই শুরু হয়েছে। যাচাই শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব হবে।
ব্যয় কেন এত বাড়ল?
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজের জন্য জাপানের মেট্রোরেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া দর আগের হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। প্রকল্পের জন্য সীমিত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করাও ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রকল্পের ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মেট্রোরেল নির্মাণের ঠিকাদার নিয়োগে বাংলাদেশ সরকার জাপানের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে যেতে পারবে না। ফলে জাপানের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই দরপত্রের প্রতিযোগিতা সীমিত রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া দর অস্বাভাবিকভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রকল্পের মোট ব্যয়ে।
তাঁর মতে, শুধু জাপানের বাজারে সীমিত দরপত্রের পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকলে নির্মাণ ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত।
এমআরটি-১-এর ব্যয় বেড়েছে ১৩০ শতাংশ
ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি-১ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
সংশোধিত প্রস্তাবে সেই ব্যয় ১৩০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রকল্পটির ব্যয় আগের হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে।
এটি শুধু একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়। ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ঋণের বোঝা, ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় এবং যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া আয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের কতটা ফেরত আসবে—এসব প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসছে।
সময়ও বাড়ছে প্রায় এক দশক
ব্যয়ের পাশাপাশি এমআরটি-১ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় সংশোধিত প্রস্তাবে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অর্থাৎ, মূল সময়সীমার তুলনায় প্রকল্পটি শেষ করতে আরও প্রায় নয় বছর সময় লাগতে পারে।
এ ধরনের সময় বৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণত নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, শ্রম ব্যয়, পরামর্শক ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বাড়ে। ফলে প্রকল্পের শুরুতে যে ব্যয় অনুমান করা হয়েছিল, দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
এমআরটি-৫ উত্তর রুটেও একই চিত্র
এমআরটি-৫-এর উত্তর রুটের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়।
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা।
সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় ১২৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ব্যয় আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
শুধু ব্যয় নয়, বাস্তবায়নের সময়ও বেড়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রস্তাবে সময় বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে দুই মেট্রোরেল প্রকল্পেই একই সঙ্গে ব্যয় ও সময়—দুই দিকেই বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
জাপানি দর নিয়ে আলোচনাই এখন মূল ভরসা
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু প্যাকেজের ক্ষেত্রে জাপানি দরদাতাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে ব্যয় কমানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আগামী কয়েক সপ্তাহেও এই আলোচনা চলবে বলে তিনি জানান।
এখানে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করা এবং একই সঙ্গে অস্বাভাবিক ব্যয় কমানো। একটি কাজ করতে গিয়ে অন্যটির ক্ষতি হলে প্রকল্পের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
সংশোধিত প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
আগের সরকারের সময় থেকেই প্রকল্প আটকে
দুই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন নয়। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য দেওয়া অস্বাভাবিক বেশি দর নিয়ে আপত্তি ওঠে।
এর ফলে প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন কার্যত থেমে যায়।
তখন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাপান সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। প্রকল্পের ব্যয় কমানোর জন্য আলোচনাও চালানো হয়।
তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেও জাপান সফর করে ব্যয় কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু জাপানের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থমকে যায়।
এর ফলে যে সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেই সময়সীমাও বাস্তবতা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যায়।
নতুন সরকার এসে আবার আলোচনায় জোর
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তিনি প্রকল্প দুটি পুনরায় চালু করতে জাপানের সঙ্গে আলোচনা করে যতটা সম্ভব ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেন।
এরপর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড জাপানি দরদাতাদের সঙ্গে নতুন করে দর কমানোর আলোচনা শুরু করেছে।
এখন এই আলোচনার ফলাফলই অনেকটা নির্ধারণ করবে, শেষ পর্যন্ত সংশোধিত ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব হবে।
বড় প্রকল্প, বড় প্রশ্ন
মেট্রোরেল ঢাকার যানজট কমানো, গণপরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। তাই এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও বাস্তবায়ন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
একটি প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেলে সেটিকে শুধু নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব দিয়ে দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বৈদেশিক ঋণ, সুদ, ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক ও সামাজিক সুবিধার হিসাব।
বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ শুরু হতে দেরি হলে ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। আবার বেশি ব্যয়ে প্রকল্প শেষ হলেও যদি প্রত্যাশিত যাত্রী ব্যবহার বা আয় না আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫-এর ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কাজ কবে শুরু হবে, তা নয়। কত ব্যয়ে কাজ শেষ হবে এবং সেই ব্যয়ের বিনিময়ে দেশের মানুষ কতটা সুফল পাবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
পরিকল্পনা কমিশনের কঠোর যাচাই এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দর কমানোর আলোচনা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন যত দেরি হবে, ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কাও তত বাড়বে। আর শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

