২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও ভ্যাট আপিলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক জামানতের হার ব্যাপকভাবে কমানোর সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ব্যবসায়ী মহল। তাদের মতে, এতে বাজারে নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে।
দেশের আপিল ফোরামগুলোতে বর্তমানে ৩৩ হাজারেরও বেশি কর মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মূলধন আটকে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার আঞ্চলিক মানদণ্ড বিবেচনায় এনে আয়কর ও ভ্যাট আপিলের জামানতের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আয়কর আপিলে এই হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ শতাংশে নামানো হচ্ছে। একইভাবে ভ্যাট ও শুল্ক বিরোধে ২০–৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৪ শতাংশ করা হচ্ছে।
কর ট্রাইব্যুনাল পর্যায়ে জামানতের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করারও প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি হাইকোর্ট পর্যায়ের আপিলেও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম জামানত দিতে হবে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তে আটকে থাকা বিপুল মূলধন মুক্ত হবে, মামলা পরিচালনার খরচ কমবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে। তবে রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জামানতের হার অতিরিক্ত কমে গেলে কিছু ক্ষেত্রে মামলা দীর্ঘায়িত করার প্রবণতা বাড়তে পারে।
২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি কোম্পানির চার বছরের আর্থিক অডিটে ৯২৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ তোলে। কোম্পানিটি অভিযোগ অস্বীকার করে ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনাল ও পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানায়। শুনানি শুরুর আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে দুই কিস্তিতে প্রায় ২০০ কোটি টাকা জমা দিতে হয়। আট বছর পার হলেও সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এখনো প্রতিষ্ঠানটি দোষী সাব্যস্ত হয়নি, তবে আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা মূলধন সুদ ও ব্যয়সহ প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আপিলের জামানত দিতে আমাদের ব্যাংক ঋণ নিতে হয়েছিল। মামলা এখনো চলছে, কবে শেষ হবে জানি না। বিপুল অর্থ আটকে থাকায় নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে।”
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মনে করছে, এই পরিবর্তন ব্যবসার জন্য বড় স্বস্তি আনবে। তাদের মতে, এতে কার্যকর মূলধন মুক্ত হবে এবং বিনিয়োগ আরও বাড়বে। প্রস্তাবিত অর্থ বিল অনুযায়ী, আয়কর আপিলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে জামানতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হচ্ছে। ভ্যাট ও শুল্ক বিরোধেও একই ধরনের বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কর প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে, যা সৎ করদাতাদের জন্য আপিল প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে সরকার বড় সংস্কার হাতে নিয়েছে। তার মতে, কর বিরোধ নিষ্পত্তির জটিলতা ও ব্যয় কমলে ব্যবসার ওপর চাপ কমবে এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, আপিলের জন্য জামানতের হার এই অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম বেশি ছিল। এতে অনেক সময় করদাতারা যৌক্তিক কারণ থাকা সত্ত্বেও আইনি লড়াইয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হতেন।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির বলেন, এটি দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে। তার মতে, “মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে বছরের পর বছর অর্থ আটকে রাখতে হতো। এখন নগদ প্রবাহ বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী হবে।”
গ্রামীণফোনের কর ও আর্থিক কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান মো. রেজওয়ান বিন রফিক বলেন, এই সিদ্ধান্ত করদাতাদের জন্য ইতিবাচক। তার মতে, আগে জামানতের কারণে করদাতাদের ওপর বড় চাপ তৈরি হতো, যা এখন কমবে এবং আপিল প্রক্রিয়ায় প্রবেশ সহজ হবে। কর বিশেষজ্ঞরা এই সংস্কারকে স্বাগত জানালেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান কম জামানতের সুযোগ নিয়ে মামলা দীর্ঘায়িত করতে পারে।
একজন কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে করদাতাদের আচরণ ও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর। তার মতে, “কিছু করদাতা কম জামানতের সুযোগ নিয়ে বিরোধ দীর্ঘায়িত করতে পারে। একই সঙ্গে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।” বর্তমানে কিছু কর মামলা নিষ্পত্তি হতে ৭ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, পুঁজিই ব্যবসার প্রাণ। তার মতে, “বছরের পর বছর অর্থ আটকে থাকলে তা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার করা যায় না। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে।” তিনি আরও বলেন, এই সংস্কার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যকে শক্তিশালী করবে।
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বহু উন্নত দেশে করদাতারা সাধারণত বড় অগ্রিম জামানত ছাড়াই কর মূল্যায়নকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সেখানে মূল জোর দেওয়া হয় দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ও কার্যকর প্রয়োগ ব্যবস্থার ওপর। কর নীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কর ব্যবস্থা এখন উচ্চ জামানতের পরিবর্তে দ্রুত নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সংস্কারের লক্ষ্য রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি ন্যায্যভাবে আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা। একজন কর্মকর্তা বলেন, “করদাতাদের অযথা আর্থিক চাপ ছাড়াই আপিলের সুযোগ থাকা উচিত, তবে ভিত্তিহীন আপিল ঠেকানোর ব্যবস্থাও থাকবে।”
আপিল ব্যবস্থার পাশাপাশি কর প্রশাসন আধুনিকায়নে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নের মতোই ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে জমা বাধ্যতামূলক করা হবে। ক্ষুদ্র করদাতাদের জন্য সহজ ভ্যাট রিটার্ন ফরম চালু করা হচ্ছে। এছাড়া কর কর্মকর্তা ও কমিশনারদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করবে, পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়াবে এবং হয়রানি কমাবে।

