একসময় পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হতো প্লাস্টিক বর্জ্যকে। কিন্তু সেই বর্জ্যই এখন দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠছে। ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে পুনরায় কাঁচামালে রূপান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে একটি চক্রাকার অর্থনীতি, যেখানে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক নতুন পণ্য তৈরির উপাদান হিসেবে ফিরে আসছে উৎপাদন ব্যবস্থায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় চার লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করছে। এর ফলে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনি কমছে আমদানিনির্ভরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ বাড়ছে।
তবে এই শিল্পের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে রিসাইক্লিং শিল্পের পরিধি বাড়লেও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ খাতে কর-সুবিধা, ভর্তুকি ও সবুজ অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশে সে ধরনের সহায়তা সীমিত। উপরন্তু পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী বড় পরিসরে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তাদের মতে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত সংগ্রহ নেটওয়ার্ক, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্প দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সবুজ শিল্পে পরিণত হতে পারে। তখন পরিবেশ দূষণের উৎস হিসেবে পরিচিত প্লাস্টিকই অর্থনীতি ও শিল্পায়নের নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ টন প্লাস্টিক কাঁচামাল বা পলিমার রেজিন আমদানি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন, পিভিসি, পিইটি, পলিস্টাইরিন ও এবিএস। দেশে বড় কোনো পেট্রোকেমিক্যাল বা পলিমার উৎপাদন শিল্প না থাকায় এসব কাঁচামালের জন্য প্রায় পুরোপুরি বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বর্তমানে শুধু গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকারই প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, অধিকাংশ প্লাস্টিক ১০ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু কার্যকর সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন উৎপন্ন হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০০৫ সালের ১৭৮ টন থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৬৪৬ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৫ বছরে এ পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে রাজধানীর একজন বাসিন্দা বছরে গড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে কতটা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে বর্জ্যের ধরন, দূষণের মাত্রা, ধোয়ার মান, বাছাই প্রক্রিয়া এবং ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। দেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত এক কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শূন্য দশমিক সাত থেকে শূন্য দশমিক নয় কেজি পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য উপাদান পাওয়া যায়।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল ২০১২ সালে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৬৯ হাজার টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তারা বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক ব্যবহার করে, যার প্রায় ১৫ শতাংশ আসে পুনর্ব্যবহৃত উৎস থেকে। এই কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ১০০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা শিল্প পার্কে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট।
গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিইএল প্লাস্টিকস উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ, ব্যবহারের পর বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনরায় নতুন পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি পূর্ণাঙ্গ চক্রাকার অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলেছে।
টিইএল প্লাস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুল হাসান বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিককে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে চক্রাকার অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্পটির সম্প্রসারণ আরও দ্রুত হবে। তার দাবি, পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, রিসাইক্লিং কার্যক্রমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার ২০০ জন এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ১২টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি এবং গ্লোবাল রিসাইকেলড স্ট্যান্ডার্ডের সনদপ্রাপ্ত বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল) বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খাদে মাহমুদ ইউসুফ বলেন, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা থাকলেও দেশের ভেতরে মূল্য সংযোজনমূলক শিল্পে ব্যবহারের জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। এছাড়া রিসাইক্লিংয়ের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ না থাকায় স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিমাণ কাঁচামাল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার মতে, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশে পিইটি পুনর্ব্যবহার শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব।
প্লাস্টিক প্রোডাক্ট বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
এ খাতে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি কারখানায় সরাসরি ২০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
বিপিজিএমইএর সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, দেশে প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে এবং এ সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তার মতে, সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। পরিবেশ সুরক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির স্বার্থে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রিসাইক্লিং শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার খাতের বড় অংশ এখনও বর্জ্য সংগ্রহকারী, ভ্যানচালক, টোকাই ও ছোট আড়তদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক অনানুষ্ঠানিক উপায়ে পুনরায় বাজারে ফিরে আসছে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার পরিবেশের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। তার মতে, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রিসাইক্লিং করছে তাদের অবশ্যই ন্যানো ফাইবার, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক উপজাত আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক চূর্ণ করার সময় বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

