চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ছিল দেশের প্রধান কনটেইনার হ্যান্ডলিং কেন্দ্র, এখন সেই জায়গা দখল করেছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। আধুনিক যন্ত্রপাতি, বাড়তি সক্ষমতা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে টানা চার অর্থবছর ধরে কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে এনসিটি।
বন্দর সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের প্রধান কনটেইনার টার্মিনালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার পরিবহন করেছে এনসিটি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জিসিবি। এরপর রয়েছে চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের (আরএসজিটি) পরিচালনাধীন আরএসজিটি চিটাগং।
তবে এই অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে শুধু পরিবহন করা কনটেইনারের সংখ্যার ভিত্তিতে। টার্মিনালের কার্যকারিতা বা দক্ষতা তুলনা করা হয়নি। কারণ, প্রতিটি টার্মিনালের জেটির সংখ্যা, জাহাজ বরাদ্দ, ক্রেন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে পুরোনো কনটেইনার সুবিধা জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি। ১৯৫৪ ও ১৯৭৯ সালে চালু হওয়া এই সুবিধার ১২টি জেটির মধ্যে ছয়টিতে কনটেইনার এবং বাকি ছয়টিতে সাধারণ পণ্য ওঠানো–নামানো হয়। দেশে কনটেইনার পরিবহনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৭ সালে এই জিসিবির মাধ্যমে। দীর্ঘদিন ধরে এটি ছিল দেশের প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল। ২০১৬–১৭ অর্থবছর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ অবস্থানে ছিল জিসিবি।
পরবর্তীতে এনসিটির চারটি জেটি পুরোপুরি চালু হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হওয়ায় পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ২০১৭–১৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জিসিবিকে ছাড়িয়ে শীর্ষে উঠে আসে এনসিটি। এরপর কয়েক বছর দুই টার্মিনালের মধ্যে অবস্থানের পরিবর্তন হলেও ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এনসিটি।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে এনসিটিতে পরিবহন হয়েছে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে জিসিবিতে পরিবহন হয়েছে ১০ লাখ ৩৬ হাজার একক কনটেইনার। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কমেছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
এনসিটির পরিচালনা ব্যবস্থাতেও এসেছে পরিবর্তন। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর আগে দায়িত্বে ছিল সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। বর্তমানে এনসিটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
জিসিবিতে কনটেইনার পরিবহন কমার কারণ হিসেবে বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, গত অর্থবছরে জিসিবিতে জাহাজ বরাদ্দ কম থাকায় পরিবহন কমেছে। তবে ছয়টি জেটির পরিচালনাকারীদের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এবং জাহাজের নিজস্ব ক্রেন ব্যবহার করেও তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
স্বাধীনতার পর নির্মিত দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনটেইনার টার্মিনাল হলো চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি। দুই জেটির এই টার্মিনাল পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ারটেক। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সিসিটিতে কনটেইনার পরিবহন হয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার একক। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই সংখ্যা কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ।
সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন জানান, সিসিটির গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো পুরোনো হয়ে যাওয়ায় মাঝে মাঝে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে কনটেইনার পরিবহন কমেছে। তিনি বলেন, এনসিটিতে প্রতি জেটিতে তিনটি করে গ্যান্ট্রি ক্রেন থাকায় সেখানে দ্রুত কনটেইনার ওঠানো–নামানো সম্ভব হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল। ২২ বছরের জন্য দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের জুনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই টার্মিনালে কনটেইনার পরিবহন হয়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার একক। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার এককে। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৬৮ শতাংশ।
টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় পাঁচ লাখ একক কনটেইনার। বর্তমানে সেখানে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর জন্য গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, চলতি অর্থবছরে পাঁচ লাখ একক কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামের পাশাপাশি মোংলা বন্দরেও সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো–নামানোর সুবিধা রয়েছে। বন্দরের দুটি জেটিতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে কনটেইনার পরিবহন হয়েছে ২৯ হাজার ৭৫১ একক। আগের বছরের তুলনায় এটি বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। তবে দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনে মোংলা বন্দরের অংশ এখনো প্রায় ১ শতাংশ।
শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্য—দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই এখন কনটেইনারনির্ভর। দ্রুত কনটেইনার খালাস ও জাহাজে পণ্য ওঠানো সম্ভব হলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের সময় ও খরচ কমে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনালের সংখ্যা বাড়লেও এখনো পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। কোন জাহাজ কোন টার্মিনালে যাবে, তা নির্ধারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, টার্মিনালগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া ইতিবাচক। তবে ব্যবহারকারীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট একক মাশুলের পরিবর্তে সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর নিচে কম খরচে উন্নত সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।

