অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো প্রয়োজন হলেও তার আগে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।
সংস্থাটির মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে জোর করে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
গয়কাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে র্যাপিড এ মূল্যায়ন তুলে ধরে। ‘বাজেট ২০২৭: সংস্কারের সংকেত, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও বাস্তবায়নের ঝুঁকি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে র্যাপিডের প্রবন্ধে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে তা থেকে অন্তত এক লাখ কোটি টাকা কম আদায় হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকেও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কম আসার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উচ্চ সুদে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়তে থাকলে সুদ ব্যয়ও বাড়বে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে যেসব ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তারা উচ্চ সুদ ও তুলনামূলক কম ঝুঁকির কারণে বেসরকারি খাতের বদলে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছে র্যাপিড। সংস্থাটি মনে করে, করোনাকালীন বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচির মতো অপব্যবহার হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সেমিনারে ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, এবারের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসা সহজীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রশংসার দাবিদার। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়লে এই উদ্যোগ জনপ্রিয়তা হারাতে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের ঘোষিত ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া সম্ভব হলে দেশের দারিদ্র্যের হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা গেলে দারিদ্র্যের হার আরও কমে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাজেট প্রণয়নে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদি কর কাঠামো ঘোষণা, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সুদের হার কমাতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, পূর্ববর্তী সরকার ঋণনির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের দায়দেনা বাড়িয়েছে এবং অর্থনীতিকে দুর্বল অবস্থায় রেখে গেছে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন না হলে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে কর্মসংস্থানের বড় কোনো বিকল্প খাত এখনও গড়ে ওঠেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের কারণে ভবিষ্যতে যাঁরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন, তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এখন থেকেই তৈরি করতে হবে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ভিয়েতনামে করপোরেট করের হার ২০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ২৭ শতাংশ। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এ হার কমানোর প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে নামানোরও দাবি জানান তিনি।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফের সঞ্চালনায় আয়োজিত সেমিনারে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতারও বক্তব্য দেন।

