বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি-বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য মন্দা দেখা দেওয়ায় চলতি অর্থবছরের জন্য বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও লক্ষ্য কিছুটা কমানো হয়েছে, তবুও বাস্তব আদায়ের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা এখনও বেশ উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি অর্থবছরের জন্য বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। তবে গত অর্থবছরে যেখানে লক্ষ্য ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, সেখানে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও সহজ হবে না বলে মনে করছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা।
কাস্টমস সূত্রের মতে, গত অর্থবছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫ হাজার টনে। এই পতনের পেছনে ভারতের আরোপিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সীমান্ত বাণিজ্যে নানা ধরনের কার্যক্রমগত জটিলতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
একই সময়ে কাস্টমস বিভাগ রাজস্ব ফাঁকি ও অনিয়ম রোধে নজরদারি বাড়িয়েছে। গত ছয় মাসে বেনাপোলে অন্তত ১৩০টি শুল্ক জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য চোরাচালানের অভিযোগে সম্প্রতি চারটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এসব মামলায় কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ মোট ৫৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি সীমান্ত বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক মনে করেন, শুধু কঠোর নজরদারি দিয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। তার মতে, আমদানি-বাণিজ্যে গতি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শুল্ক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে আরও কার্যকর তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
অন্যদিকে, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে কাস্টমস বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, শুল্ক ফাঁকি ও সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেনাপোল কেবল একটি স্থলবন্দর নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে এখানকার আমদানি কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব আয়, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহের ওপর। তাই শুধু রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কমানো নয়, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানো, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সীমান্ত বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাও এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

